Home » করোনা বিষয়ক লেখা » শাহ‌রিয়ার সো‌হেলের গল্প-কৃষ্ণচূড়ার ম‌তো থোকা থোকা লাল

শাহ‌রিয়ার সো‌হেলের গল্প-কৃষ্ণচূড়ার ম‌তো থোকা থোকা লাল

Spread the love

 

কৃষ্ণচূড়ার ম‌তো থোকা থোকা লাল

শাহ‌রিয়ার সো‌হেল

 

বেতন হয়নি এখ‌নো এমন একটি বেসরকারি কলেজে চাকরি করেন তিনি। অনেকের হাত পা ধরে মোটা অঙ্কের টাকা ডোনেশন দিয়ে তারপর এক অনিশ্চিত কলেজে চাকরি পেয়েছেন। ডোনেশনের টাকা জোগাড় করেছেন বাবার কিছু জমিজমা বিক্রি করে এবং কর্জ করে। সে টাকার সুদ ক্রমশ বেড়েই চলছে। কীভাবে শোধ হবে তিনি জানেন না। তার ছেলের প্রথম জন্মদিন ভালোভাবে উদযাপন করতে পারেননি। ইচ্ছা ছিল আশেপাশের কিছু লোককে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াবেন। হলো না। ভে‌বে‌ছি‌লেন বেতন  হলে নিশ্চয়ই তিনি দ্বিতীয় জন্মবার্ষিকী ধুমধাম করে পালন করবেন। হ‌লো না। ভেবেছিলেন তৃতীয় জন্মবার্ষিকী পালন করবেন। হ‌লো না। এভাবে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ,,, হলো না, হলো না আর হলো না। একটি ভাঙা সাইকেল নিয়ে তিনি কলেজে যাতায়াত করেন। ভাবেন, এবার হয়তো বেতন হয়ে যাবে। হ‌লো না। চোখের সামনে মনের ভেতর রাশ রাশ হতাশা ফে‌নিলোচ্ছ্বা‌সে ভে‌সে বেড়ায় বিস্তৃত প‌রিধী জুড়ে।

দিন যায়,,, দিন চলে যায়,,,। চোখে চালছে পড়ে। চশমার কাচের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হয় বহুগুণ। সাইকেলের বেশ কয়েকটি স্পোক ভেঙে গেছে। সাইকেলের মাঠ-ঘাট নেই। টিউবে অজস্র জোড়া লাগানো। টায়ার সেলাই করা। তবু তিনি কলেজে যান নিয়মিত। এবার হয়তো বেতন হবে, এক বুক প্রগাঢ় মিথ্যে বিশ্বাস নিয়ে তিনি সদম্ভে হেঁটে ফেরেন।

কৃষ্ণচূড়ার ফুল তার খুব প্রিয়। এত ভালো লাগে কেন, সে নিজেও জানে না। এত বৃহৎ বিস্তৃত আঙ্গিনা জুড়ে যে বৃক্ষ থোকা-থোকা লাল এর বন্যা বইয়ে দেয়, তার বুকের বেদনাও হয়তো অনেকটা এরকমই। তাই হয়তো মিলে মিশে যায়, কৃষ্ণচূড়ার সাথে অপরিসীম ভালোবাসায়। সুযোগ পেলেই তিনি কৃষ্ণচূড়ার কাছে আসেন। হৃদয়ের দগদ‌গে লাভার মতো কষ্টের ফুল দেখেন। বেদনা জড়িত আবার আনন্দে উদ্ভাসিত স্বকীয় সত্তা।

ক‌লেজ আঙিনায় অনেকগুলি কৃষ্ণচূড়ার গাছ ছিল। একদিন বাসায় ফেরার পথে এক বালককে জিজ্ঞাসা করল, সে কৃষ্ণচূড়া গাছে উঠতে পারে কিনা? প্রচুর ফুল হয়েছে সে সময়। দু’টাকা দেয়া হবে বলতেই বালকটি সানন্দে রাজি হয়ে যায়। শিক্ষক দেখলেন, দু’টাকার কথা শুনতেই ছেলেটি কেমন ফুরফুরে বাতাসে নেচে উঠল। তার মনে হলো, ছেলেটির দু’হাতের পাশ থেকে দুটি অদৃশ্য ডানা গজিয়েছে। সে তরতর করে দীর্ঘ বৃক্ষের শীর্ষে উঠতে লাগল। মাঝে মাঝে শিক্ষক ভয় পাচ্ছিলেন, যদি পড়ে যায় ! ধীরে ধীরে উঠতে বললেন তিনি। কিন্তু ছেলেটি যেন কোন কথাই শুনতে পাচ্ছিল না ! সে গাছের শীর্ষে উঠে বেশ কয়েক গোছা ফুল পেড়ে দিল। শিক্ষক খুব খুশি হলেন। তরতর বেগে প্রবাহিত পানির স্রোতের মতো নেমে এলো ছেলেটি। দু’টাকা দিতেই বাতাসে ডানা গজিয়ে প্রজাপতির মতো উড়ে গেল। এই অতি তুচ্ছ-অল্প-নগন্য-সামান্য টাকা দিয়ে সে কী করবে ? তার চোখে-মুখে যে আনন্দের প্লাবন দেখা গেল, তা অকল্পনীয়-আশাতীত। ছেলেটি কি এক কাপ লাল চা আর একটি সিঙ্গাড়া খাবে ? নাকি মুড়ি খাবে ? নাকি আইসক্রিম খাবে ? নাকি পাউরুটি খাবে ? নাকি জমাবে ? নাকি খেয়ে ফেলবে পৃথিবী সব-সব যাবতীয় সুখাদ্য ? দু’টাকার জন্য হয়তো বালকটির ঘুম হয়নি দু’রাত !

শিক্ষক ভাবেন, তার মৃত্যু হলে, কেউ যদি তার কবরের মাটিতে মাথার ওপর একটি অনবদ্য কৃষ্ণচূড়ার গাছ লাগিয়ে দেয়, তাহলে তিনি খুব খুশি হবেন। তার বুকের অজস্র বেদনাও পুঞ্জীভূত থোকা-থোকা লাল হয়ে ছড়িয়ে পড়বে দশ-দিগন্তে…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*