Home » 2020 » May

Monthly Archives: May 2020

মো. সামসুজ্জামানের কবিতা-ঢেউ তোলা তরঙ্গে ভাসে দিন রাত

 

ঢেউ তোলা তরঙ্গে ভাসে দিন রাত

মো. সামসুজ্জামান

কত জীবনের-কত রকমের

খেলা দেখি, বিস্ময়ে জীবন মৃত্যুর

অমানিশায় ভুগি, তবু জানিনা

কখন কি হবে জীবনের খেলা ঘরে।

এসেছি পৃথিবীর পরে- অভিনয়

রঙ্গমঞ্চে আমি দেখেছি কত মানুষের

অজস্র আহাজারি-কেহ হাসে, আবার

কেহ বা কাঁদে- কেহ বা রঙ্গ রসের

নাগর দোলায় ঘুরপাক খেলে।

এই সব জীবনের নানা রকম ছবি

যখন ভেসে ওঠে আমার হৃদয় অন্তরে,

তামাশার দুর্বিপাকে- তখন ভুলে যাই স্মৃতির বেদনায়

লেগে থাকা দুঃখের আঁধার রাত্রির

দুঃস্বপ্নের কত যন্ত্রণার ছবি-

দেখি, পৃথিবীর জীবন মৃত্যু

ভালবাসা মুহূর্তের ছলনায়

আটকে যায় তার অস্তিত্ব

বজায় রাখার প্রবল আশায়-

জীবনের সাধ, স্বপ্নের ঢেউ তোলা তরঙ্গে

ভাসে দিন রাত।

আমিরুল ইসলাম রন্টুর কবিতা-বুড়ি

 

বুড়ি

আমিরুল ইসলাম রন্টু

ও পাড়ার এক বুড়ি

ভাজে শুধু মুড়ি,

হাতে বাজায় তুড়ি

নেই তার জুড়ি।

বাক বাকুম পায়রা

আস্তে খেলিস ভায়রা

কুড়ি মুড়ি খায় না

নেই কোন বায়না।

কাছে কেউ যায় না

আছে কেবল গয়না।

একটু যদি যায়

অমনি ঘাড় মটকায়।

শাহ‌রিয়ার সো‌হেলের গল্প-কৃষ্ণচূড়ার ম‌তো থোকা থোকা লাল

 

কৃষ্ণচূড়ার ম‌তো থোকা থোকা লাল

শাহ‌রিয়ার সো‌হেল

 

বেতন হয়নি এখ‌নো এমন একটি বেসরকারি কলেজে চাকরি করেন তিনি। অনেকের হাত পা ধরে মোটা অঙ্কের টাকা ডোনেশন দিয়ে তারপর এক অনিশ্চিত কলেজে চাকরি পেয়েছেন। ডোনেশনের টাকা জোগাড় করেছেন বাবার কিছু জমিজমা বিক্রি করে এবং কর্জ করে। সে টাকার সুদ ক্রমশ বেড়েই চলছে। কীভাবে শোধ হবে তিনি জানেন না। তার ছেলের প্রথম জন্মদিন ভালোভাবে উদযাপন করতে পারেননি। ইচ্ছা ছিল আশেপাশের কিছু লোককে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াবেন। হলো না। ভে‌বে‌ছি‌লেন বেতন  হলে নিশ্চয়ই তিনি দ্বিতীয় জন্মবার্ষিকী ধুমধাম করে পালন করবেন। হ‌লো না। ভেবেছিলেন তৃতীয় জন্মবার্ষিকী পালন করবেন। হ‌লো না। এভাবে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ,,, হলো না, হলো না আর হলো না। একটি ভাঙা সাইকেল নিয়ে তিনি কলেজে যাতায়াত করেন। ভাবেন, এবার হয়তো বেতন হয়ে যাবে। হ‌লো না। চোখের সামনে মনের ভেতর রাশ রাশ হতাশা ফে‌নিলোচ্ছ্বা‌সে ভে‌সে বেড়ায় বিস্তৃত প‌রিধী জুড়ে।

দিন যায়,,, দিন চলে যায়,,,। চোখে চালছে পড়ে। চশমার কাচের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হয় বহুগুণ। সাইকেলের বেশ কয়েকটি স্পোক ভেঙে গেছে। সাইকেলের মাঠ-ঘাট নেই। টিউবে অজস্র জোড়া লাগানো। টায়ার সেলাই করা। তবু তিনি কলেজে যান নিয়মিত। এবার হয়তো বেতন হবে, এক বুক প্রগাঢ় মিথ্যে বিশ্বাস নিয়ে তিনি সদম্ভে হেঁটে ফেরেন।

কৃষ্ণচূড়ার ফুল তার খুব প্রিয়। এত ভালো লাগে কেন, সে নিজেও জানে না। এত বৃহৎ বিস্তৃত আঙ্গিনা জুড়ে যে বৃক্ষ থোকা-থোকা লাল এর বন্যা বইয়ে দেয়, তার বুকের বেদনাও হয়তো অনেকটা এরকমই। তাই হয়তো মিলে মিশে যায়, কৃষ্ণচূড়ার সাথে অপরিসীম ভালোবাসায়। সুযোগ পেলেই তিনি কৃষ্ণচূড়ার কাছে আসেন। হৃদয়ের দগদ‌গে লাভার মতো কষ্টের ফুল দেখেন। বেদনা জড়িত আবার আনন্দে উদ্ভাসিত স্বকীয় সত্তা।

ক‌লেজ আঙিনায় অনেকগুলি কৃষ্ণচূড়ার গাছ ছিল। একদিন বাসায় ফেরার পথে এক বালককে জিজ্ঞাসা করল, সে কৃষ্ণচূড়া গাছে উঠতে পারে কিনা? প্রচুর ফুল হয়েছে সে সময়। দু’টাকা দেয়া হবে বলতেই বালকটি সানন্দে রাজি হয়ে যায়। শিক্ষক দেখলেন, দু’টাকার কথা শুনতেই ছেলেটি কেমন ফুরফুরে বাতাসে নেচে উঠল। তার মনে হলো, ছেলেটির দু’হাতের পাশ থেকে দুটি অদৃশ্য ডানা গজিয়েছে। সে তরতর করে দীর্ঘ বৃক্ষের শীর্ষে উঠতে লাগল। মাঝে মাঝে শিক্ষক ভয় পাচ্ছিলেন, যদি পড়ে যায় ! ধীরে ধীরে উঠতে বললেন তিনি। কিন্তু ছেলেটি যেন কোন কথাই শুনতে পাচ্ছিল না ! সে গাছের শীর্ষে উঠে বেশ কয়েক গোছা ফুল পেড়ে দিল। শিক্ষক খুব খুশি হলেন। তরতর বেগে প্রবাহিত পানির স্রোতের মতো নেমে এলো ছেলেটি। দু’টাকা দিতেই বাতাসে ডানা গজিয়ে প্রজাপতির মতো উড়ে গেল। এই অতি তুচ্ছ-অল্প-নগন্য-সামান্য টাকা দিয়ে সে কী করবে ? তার চোখে-মুখে যে আনন্দের প্লাবন দেখা গেল, তা অকল্পনীয়-আশাতীত। ছেলেটি কি এক কাপ লাল চা আর একটি সিঙ্গাড়া খাবে ? নাকি মুড়ি খাবে ? নাকি আইসক্রিম খাবে ? নাকি পাউরুটি খাবে ? নাকি জমাবে ? নাকি খেয়ে ফেলবে পৃথিবী সব-সব যাবতীয় সুখাদ্য ? দু’টাকার জন্য হয়তো বালকটির ঘুম হয়নি দু’রাত !

শিক্ষক ভাবেন, তার মৃত্যু হলে, কেউ যদি তার কবরের মাটিতে মাথার ওপর একটি অনবদ্য কৃষ্ণচূড়ার গাছ লাগিয়ে দেয়, তাহলে তিনি খুব খুশি হবেন। তার বুকের অজস্র বেদনাও পুঞ্জীভূত থোকা-থোকা লাল হয়ে ছড়িয়ে পড়বে দশ-দিগন্তে…।

শেখ হামিদুল হকের কবিতা-রুখতে হবে

 

রুখতে হবে

শেখ হামিদুল হক

কর্মহীন সকল মানুষ আছে গৃহবন্দি,

খাদ‌্যাভা‌বে পে‌টের সা‌থে কর‌ছে নিত‌্য স‌ন্ধি।

ছুট‌ছে সবাই ত্রাণের জন‌্য ত্রাণ দাতার বা‌ড়ি,

দাঁ‌ড়ি‌য়ে থা‌কে রো‌দের বু‌কে অভা‌বীদের সা‌রি।

সবার ভা‌গ্যে জুট‌বে না ত্রাণ দ‌লের লোক ছাড়া,

ঘোষক ব‌লেন, না শুন‌লে লা‌ঠি মে‌রে তাড়া।

হতাশ সু‌রে ব‌লে সবাই,দল আমাদের নাই,

সকাল থে‌কে সন্ধ‌্যাবধি গতর বে‌চে খাই।

লোক লজ্জায় কেউবা আবার কষ্ট চে‌পে রা‌খে,

কেমন ক‌রে ঘুঁচ‌বে এ ভার দিন রা‌ত্রি ভা‌বে।

‌দে‌শের প্রধান দি‌শেহারা জনগ‌ণের ক‌ষ্টে,

লু‌টেরার দল ব‌্যস্ত আছে দেশের সম্পদ নষ্টে।

বঙ্গবন্ধু ব‌লে‌ছি‌লেন,পে‌য়ে‌ছি চোরের খ‌নি,

চুরি ক‌রে সেই চো‌রেরা হ‌চ্ছে সবাই ধনী।

রুখ‌তে হ‌বে অপকর্ম আমার দে‌শের জন‌্য,

স্বাধীনতার সুফল পে‌য়ে সবাই হ‌বে ধন‌্য।

জাহিরুল মিলনের কবিতা-সাংবাদিক

 

সাংবাদিক

জাহিরুল মিলন

তুমি সত্য তুমি যোদ্ধা

তুমি অকুতোভয় বীর

যত মিথ্যার শৃংখল আছে

ভেংগে কর চৌচির।

তুমি বলাকার মত স্বাধীন

সত্যে অবিচল মিথ্যার বিরুদ্ধে মাইন।

কাগজ তোমার বর্ম কলম তোমার অস্ত্র

লেখ তুমি যত অন্যায় অবিচার

বাধাকে তুমি অতিক্রম কর

অন্যায়ে হবে ক্ষুরধার।

তুমি দুরন্ত তুমি বারুদ ঠাসা বোমা

সত্যের সাথে গলাগলি মিথ্যার নেই ক্ষমা।

কালি, কলম, কাগজ সাথে

ক্যামেরা চেপে কাঁধে

চলেছে সে সংবাদ খোঁজে

পৃথিবী থেকে চাঁদে।

তুমি শান্ত তুমি মমতার আধার

তুমি রুদ্রমূর্তি শত্রুদলন বাধার।

অসহায় নিষ্পেষিত মানুষের পাশে

দাঁড়াও তুমি স্বজন মনে

এগিয়ে যাও বীরদর্পে

বিপদসংকূল ক্ষনে।

তুমি মানবতা তুমি সূর্যরথ বাগ

তুমি রুষ্ট তুমি দৃঢ় কঠোর রাগ।

সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য

তোমার সেটা অজানা

মর্ত পাতাল যেথায় যাও

নেই কো তোমার মানা।

মরনে তুমি শহিদ বাঁচলে হবে গাজী

ভংগুর পথ, শত্রু চারিদিক তবুও যেতে রাজি।

পথে পথে খবরে খবরে

তুমি থাক মিশে

তুমি আছ সবার হৃদয়ে

বাকিরা যাবে ভেসে।

তুমি নির্মম তুমি ভয়হীন অজগর

ঝাঁপিয়ে পড় সংবাদে তুচ্ছ মৃত্যু জ্বর।

দূর্গম পথ, বজ্রপাত, ঝড়-ঝঞ্জা মাড়িয়ে

চলেছ জীবন রেখে বাজি

বিপদ ভেদিয়া বুক পাতো তুমি

দেশের তরে জীবন দিতেও রাজি।

সত্য মিথ্যা খুঁজে পেতে ছোটে যে দিকবিদিক

সেই হল দেশপ্রেমী সেইতো সাংবাদিক।

আরাফাত হোসেনের কবিতা-একি অপরূপ প্রকৃতি

 

একি অপরূপ প্রকৃতি

আরাফাত হোসেন 

 

আমি এক নিরঞ্জন ভাবার্থ কবি,

প্রকৃতিকে ভালোবাসতে গিয়ে- – –

ভালবাসতে পারেনি নারী।

আমি ক্লান্ত আমি শ্রান্ত,

তবুও প্রকৃতির প্রেমে আমি মুগ্ধ।

 

রমণী মোরে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে

দেখেছি আমি রমণীর চোখে জল,

সেই ব্যথার জল যে আমার কাছে জল ছিলনা

মনে হতো যেন একি অপরূপ দৃশ্য নেমে আসছে- – –

ঐ আকাশের ঢল !

 

আঁকা-বাঁকা ঠোঁটে নারীর সুশ্রী হাঁসি,

ঐ হাঁসির প্রতিটি ধ্বনি মনে হয় যেন- – –

দুরন্ত গতিতে পড়ন্ত ঝর্ণার কলকল ধ্বনি !

আমি ভালোবাসি আজও ভালবাসি,

এই বাংলার প্রকৃতির ছবি।

 

মোরে ডাকিয়া নারী যখন তাহার মনের কথা কয়,

মনে হয় যেন শীতের শিশিরে শিমুল গাছে

পাখির ডাকাডাকির কিচিরমিচির ধ্বনি শোনা যায় !

বাতাসের দোলায় দুলতে থাকে যদি নারীর এলোকেশ,

তখনই মনের প্রতিছবিতে ভেসে আসে

কোন এক নদীর চরে দুলছে কাঁশবনের দেশ।

 

একি অপরূপ প্রকৃতির সুন্দর মায়াজাল,

এই বাঁধন থেকে কেউ ছাড়া পাবেনা কেউ কোন কাল !

আহ্ ! একি অপরূপ প্রকৃতির সুন্দর মহাকাল।

অ্যাড. শেখ তাজ হোসেন তাজুর কবিতা-ধনী গরীবের ঈদ

 

ধনী-গরীবের ঈদ

অ্যাড. শেখ তাজ হোসেন তাজু

এসেছে ঈদ,ওরে নাহি ধনী-গরিবের নীদ।

আছে যতসব ধনী,মুখে নিচ্ছে দিবারাত্রি ননী।

খুশিতে ছড়াচ্ছে মানি কখনো দেখছে না গুনি।

যে দরিদ্র,কুলি মজুর,মুটে বেড়াচ্ছে দিনরাত ছুটে।

রোড,ঘাট,পাড়া এ বাড়ী ও বাড়ী বেড়াচ্ছে ঘুটে,

যদি এ ঈদে পরিবারের তরে ভালো কিছু জোঠে।

সকালে খেয়ে পান্তা থাকছে মাথাভরা চিন্তা,

পিতা-মাতা, স্ত্রী, পুত্র,কন্যা পরিজন,চেয়ে আছে কখন

নতুন,জামা, পাঞ্জাবি নিয়ে বাড়ি ফিরবে বাপ ধন।

বাঁপধনের আছে মন, পরিবারের তরে কিছু নিয়ে

আসবে বাড়ি, কিন্তূ ধনী মৌলভী সাব পড়েছে

কোরআন,হাদিস,রেখেছে দাঁড়ি,ফিতরা জাকাতের

নামে ছাড়ছে না কোন মালকড়ি। রেখেছে দারোয়ান,

গাড়োয়ান, কিনেছে লুঙ্গি,শাড়ী,রেখেছে কিছু দারোয়ান

ঘুরাচ্ছে তারা ছড়ি তাই যাকাতের বদলে বাপধনের

পিঠে পড়লো বাড়ি। কাঁদিতে কাঁদিতে বাপধন ফিরলো

বাড়ি, ঈদের দিন চুলায় উঠলো না হাঁড়ি। পিতা-মাতা,

স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পরিজন সকলে মিলে একঘরে বসে

শুরু করলো ক্রন্দন। ক্রন্দন শুনে ধনী করলো পণ

সামান্য সাহায্য করে তোর যা কিছু ধন কেড়ে নেবে

এখন। নিত্য এ দৃশ্য দেখে এবার টলিছে আসমান

তাই তো এসেছে করোনা সহ আম্পান।যদি বাঁচিতে

চাও,জাকাত,ফিতরা যা কিছু আছে গরীবের পিছনে

বিলিয়ে দাও। যদি ঠিকমতো আদায় করো গরীবের

হক,আল্লাহ দয়া করিয়া তোমায় করিবে মাফ।

হে ‘কুন্জুস’, হে মৌলভী সাব সময় আছে এখনই চাও

পরম দয়াময় মহান আল্লাহর দরবারে মাফ

 

মোঃ সুমন রেজার কবিতা-ভিন্ন স্বাদের ঈদ

 

ভিন্ন স্বাদের ঈদ

মোঃ সুমন রেজা

ঈদের খুশি- ঈদের হাসি-শুভেচ্ছা বিনিময়,

আজ তার রঙ্গিন আবেদন ম্লান মনে হয় –

খুব ভোরে ঘুম ঘুম চোখে জেগে ওঠা অজানা আহ্লাদে,

সব আয়োজন আজ মলিন হয়ে মিশেছে অন্ধকারে –

সেমাই-চিনি-ফিরনী-পায়েশ কত রকমারি আয়োজন,

এখনো আছে তেমন তবে আবেগের বড্ড প্রয়োজন –

নতুন পোশাকের ঘ্রাণ নিতে নিতেই ফুরিয়ে যেত বেলা,

এখনো নতুন পোশাক ঠিক কিনি তবে ঘ্রানে অবহেলা-

সকাল সকাল স্নান সেরে উঠোন জুড়ে পায়চারি,

এখনো হয়তো হয় তবে সে আবেগ ভীষণ ভারি –

নারকেল কুরা আর বাদাম ভাজার গন্ধে চিত্ত হতো আকুল,

এখন গন্ধ ঠিকই আসে নাকে তবে মন হয় না ব্যাকুল –

নতুন পাঞ্জাবি, পাজামা ,জুতো আর টুপি দিয়ে মাথায়,

আতর দিয়ে ভিজিয়ে নিতাম মনের আসন পরম মমতায়-

অদ্ভুত এক আবেগমাখা অনুভূতি ছিল ঈদের সেলামীতে,

এখন সেটা ভিন্ন ভীষণ -ব্যস্ত সবাই উদ্ভট সংস্কৃতিতে –

তড়িঘড়ি করে যৎসামান্য মিষ্টান্ন উদরে চালান দিয়ে,

দ্রুত পায়ে ঈদগাহে ছুটি জায়নামাজটা কাঁধে নিয়ে –

বাতাসে ভেসে থাকতো সীমাহীন আনন্দের উল্লাসী আবাহন,

নাচতো সদাই মহানন্দে দিগন্ত প্রসারী মহাসুখে প্রাণোমন।

ঈদের নামাজ আদায় শেষে পরম দরদে চোখ কাঁপে মিটিমিটি,

কোলাকুলির হিড়িক পড়ে – যেন অপূর্ব এক সহানুভূতির চিঠি-

আর এখন এসেছে কি এক অদ্ভুত অপ্রচলিত রীতি,

খোলা হাতে করমর্দন করতেও মনে জাগে করোনার ভীতি –

কোলাকুলির কৌতুহলেও আজ মন দেয় না সাড়া,

হাজারো সুখের মাঝেও কমেনি করোনার প্রাণ কাড়া –

ঘরের চালেতে হুতুম ডাকে এখন অবিরত- অকল্যাণ এর সুর,

সামাজিক দূরত্বের নামে মন থেকে মন এখন থাকছে বহুদূর ,

ঈদের দীপ্তি কখনো না হোক ম্লান – আগামী দিনের আশা,

ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রান, মন আর প্রেম হোক চিত্তের ভাষা।

জহর দফাদারের গল্প-ডাক্তার আসিবার পূর্বেই

 

 

 

 ডাক্তার আসিবার পূর্বেই

জহর দফাদার

 

কবির আসতে একটু বিলম্বই হয়েছে; ঘাট হয়েছে- নতমুখে স্বীকার করতে কোনও বাধা নেই। কবি প্রস্তুত!
বারবার বলে দিয়েছে ডাক্তার, ঠিক সাড়ে চারটেয় দেখা হবে মধ্যশহরের একমাত্র লাল-নীল-হলুদ-বেগুনি-সবুজবেষ্টিত সৌন্দর্যে।
প্রথম দেখা হবে, চারচোখের মহামিলন!
কবি- একদম অগোছালো! যথারীতি সময়জ্ঞানের ঘাটতি নিয়ে পাঁচটার দিকে জোরকদমে আপিস ছাড়ে।
রাস্তাটা বড় বেহায়া মনে হয় তার। রিকশার টুংটাং, ট্যাক্সির ভেপু, মোটরসাইকেলের কান ঝালাপালা বিরক্তিকর শব্দ মোটেও সহ্য হয় না ইদানিং।   অথচ, এই ধুলোভরা শহরটাকেই আজন্ম ভালবেসে থেকে গেছে সে।
ফুটপাথ ধরে এগুতে গিয়েই চোখে পড়ে জীর্ণ-শীর্ণ হাতপাতা মানুষের দল। চোখ সয়ে আসা হকারদের কাব্যিক আহ্বান- আসেন, আসেন- কম রেট, মাল ভাল !
উরাধুরায় বন্দী এই জীবনের স্রোতে হঠাৎ করেই সবুজের হাতছানি!
আজ ডাক্তার আসিবার পূর্বেই কবি ঘটনাস্থলে পায়চারি করবে- দৃঢ়তার কমতি ছিল না একটুও।
কিন্তু ছয় ইঞ্চি কপাল যে তার; আপিসের বস- বেরুনোর আগেই ডাক দিলেন- স্টোরিটা একটু দেখে দিয়ে যাও, কবি ! কালকের পাতায় ছাপা হবে যে !
বসের খুব বিশ্বস্ত কবি; শুধুই বিশ্বস্ত কেবল কাজের জন্যে।
ইতস্তত করতে থাকে সে, বস- একটু তাড়া ছিল যে !
: আরে, সামান্য একবার চোখ বুলিয়ে গেলেই হবে ! তোমার চোখে যাদু আছে- এক ঝাপটায় সব এলামেলো কথা পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে…

সবুজের বিশাল গেটখানার সামনে পৌঁছে গেছে কবি।
বুকের ভেতর থেকে দুঃশ্চিন্তার ধুলোমাখা বাতাস দ্রুত বের হয়ে যায়। সেখান থেকে পরমানন্দের একটা মৃদূ শব্দ বের হয়- আহ !
ভেতরে ঢুকেই ডাক্তারের স্কেচ করা দক্ষিণ-পূর্ব কোণার বেঞ্চের দিকে দ্রুত পায়ে এগুতে থাকে সে। গাছপালা-আর ঝোপের আবডালে কিছুই দেখা যায় না। সে হাঁটতে থাকে…

দু’চার মিনিটেই পৌঁছে যায় লোহা আর কাঠের অপূর্ব কম্বিনেশনে তৈরি বেঞ্চের দিকে!
ঘড়ি দেখে, ৫টা ১৫ মিনিট ! ডাক্তার তবে কি চলে গেলো ?
কেউ নেই। বুকের ভেতর দুম করে মোচড় দেয়; কষ্টের দলা উঠতে থাকে। কত কথা পাক খায় মস্তিষ্কে, ঝিম ঝিম করতে থাকে।
বেঞ্চের সামনে নীলজলের পুকুর। পাড়টি ভরা দুবলোয়; দু’একটা ঘাসফুল চকচক করছে তারুণ্যের রঙে। বাতাসে দোল খাচ্ছে দুবলোর কচি ডগা !

আজ দেখা হবে ডাক্তারের সঙ্গে। কতকিছু তার কল্পনায় রঙ ছড়িয়ে ছিল। কী রঙের ড্রেস পরা থাকবে তার, গায়ে অ্যাপ্রন জড়িয়ে আসবে, না কি ময়ূরকণ্ঠীরঙা শাড়ি? না কি হালকা গোলাপি কামিজের সঙ্গে টকটকে লাল টিপ কপালজুড়ে… আনমনা হয় সে
আজ ডাক্তার তাকে গান শোনাবে !
ডাক্তারের মিষ্টিকণ্ঠে রবিঠাকুরের গান কেমন শোনাবে ! ও কি আধুনিক গান করে ? ভাবনায় কতকিছুই আসছে। অথচ, কবির সামনে কেবল জল আর জল !
চিন্তার পরিবর্তন ঘটে হঠাৎ; পেছনে কার পায়ের শব্দ শোনা যায়। চকিত পিছু ফেরে সে !
হা হা হা
বাদামওয়ালা ছেলেটা তার কর্কশকণ্ঠে হাঁক দেয়, বা..দে..ম ! স্যার, অ্যাকলা বইসা রইছেন, একটা ঠোঙা লন- টাইম পাস !

স্বপ্নের ছায়াছবিতে ছন্দপতন ঘটে কবির। সম্বিত ফিরে পায়, দাও-
বেঞ্চে বসে বাদাম চিবুতে চিবুতে কল্পনার রঙ ফের ছড়ায় সে।
কবি নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে।  ইশশশ, সময়মতো আসতে পারলে আজ দেখা হতো, কথা হতো, গান শোনা… সবকিছু ওই শালার বসের কারণে। বসকে কষে কয়েকটা ডাস্টবিনসম গাল দিয়ে দেয় সে।
সময়ের হেরফেরে আজ এই দিনটা আনন্দময় স্মৃতির বিপরীতে বিষাদময় নীলরঙা ক্যানভাস হয়ে গেল- ভাবতে ভাবতে দু’চোখের কোণে চিক চিক করে ওঠে শিশিরবিন্দু! নিজেকেই ধিক্কার দিতে থাকে সে ।

খুব চায়ের তেষ্টা পেয়ে তার। বেঞ্চ থেকে উঠে আশপাশে তাকায় কবি। আশেপাশে কোলাহলময় আনন্দউল্লাস নজরে আসে তার। কেবল নিজের বুকের ভেতরটাই খা খা করছে। গোটা সবুজ অরণ্য এক লহমায় দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনে। একটু জটলা দেখে পা বাড়ায় সে…

তিন চার তরুণ এক ফ্লাস্কওয়ালার কাছ থেকে ওয়ান টাইম কাপে চা নিচ্ছে, হৈ হট্টগোল করেই। তাকে দেখে ছেলেটা জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকায়।  হা সূচক মাথা নেড়ে ফের সেই বেঞ্চে গিয়ে বসে।
ছেলেটি সুন্দর ফুলছাপা একটি কাগজের কাপে এক কাপ চা এগিয়ে দেয়।
চায়ে চুমুকের সঙ্গে সঙ্গে ধোয়ার নেশাটা মাথাচাড়া দিলে শান্তিনিকেতনের ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একটা শলাকা ঠোঁটে লটকে দেয়। দিয়াশলাইয়ের কাঠিতে আগুন জ্বেলে সম্মুখপাশে ধরে সে।  একবুক ধোয়া সরাসরি পাঠিয়ে দেয় ফুসফুসে, এরপর পরম যত্নে নাকমুখ দিয়ে বের করে প্রশান্তির শব্দ করে- আহ !

ডাক্তারের অদেখা মুখটি কল্পনায় আঁকার চেষ্টা করে কবি। মায়াবিমুখে প্রসন্নতার ছায়া তাকে এনে দেয় প্রশান্তি।
ভাবনার জগতে ফের হারাবে সে।

কবি !
ডাকটা বেশ পরিচিতই মনে হয় তার। নিজের নামটি এভাবে কারো মুখে সে শোনেনি এই জনমে। এমন মধুঝরা, চুড়ির ঝঙ্কার- শোনেনি সে আগে।
পিছু ফিরতেই তার চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন হয় !
মুখ থেকে অগোচরে বেরিয়ে যায়, প্রায় অস্ফুটস্বর- ডাক্তার !

অপলক চেয়ে থাকে সে।  কল্পনাকে হার মানানো রঙে এসেছে এক মায়াভরা মুখ। তার মুখায়বে ঝরে পড়ছে জগতের সব কৌতুহল। রেলের মতো বয়ে চলে ডাক্তারের কথার বগি- জানো পথে কী যানজট ! একটার পর একটা রিকশা থামায়, কেউ যাত্রী নিতে চায় না। আধাঘণ্টার মতো কেবল তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা কেউই সওয়ার নেবে না, আসবে না এই সবুজারণ্যে… অগত্যা, পা সম্বল করেই- তুমি অনেকক্ষণ বসে আছো, তোমার অনেক বোরিং সময় গেছে। খুবই শরমিন্দা, আসলে আমার করার কিছুই ছিল না…

কবির কর্ণকূহর স্থবির; কিছুই শুনতে পায় না সে। তার দু’চোখজুড়ে ডাক্তারের ধনুকবাঁকা ভ্রু, হরিণচোখের ছোটাছুটি, গোলাপের পাপড়ির মতো ওষ্ঠধারার নাচন !

রাজ পথিকের কবিতা-অন্যরকম ঈদ

 

অন্যরকম ঈদ

 রাজ পথিক

এমন ঈদ আগে কখনো আসেনি,

আনন্দটুকু প্লাবনে ভেসে

শোকের নহর বহেনি!

বাঁধভাঙা খুশির দুয়ারে

শিকল বাঁধা পড়েনি।

সিয়াম সাধনে… মৃ্ত্যুর রোদনে,

বিচ্ছিন্ন মোনাজাত কভু হয়নি।

এমন ঈদ…আগে কখনো আসেনি!

সংযম তপস্যা সেরে…

একাপরে বিভেদ ভুলে,

এক কাতারে মোনাজাত

সৌহার্দ্যপূর্ণ মোলাকাত,

হৃদ্রতার উচ্ছ্বসিত আড়ম্বরে…

কুশলাদি বিনিময় করমর্দনে।

সবই নিষ্প্রভ আজ…

অদৃশ্য দানবের হানায়,

দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ কাটছে দিন-রাত।

তবুও সুস্থ হোক পৃথিবী…

ধরিত্রি’র বুকে ফিরুক শান্তি,

পবিত্র আলিঙ্গনে মিলুক প্রশান্তি।

ভালো থাকতেই একটা ঈদ,

কাটলো না হয় ঘরে বন্দি…।

জানালায় বসেই চাঁদ আর খুশির

এবারের মতো হোক সন্ধি।