Home » 2022

Yearly Archives: 2022

বিদ্রোহী কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিএসপির কবিতা পাঠ

স্টাফ রিপোর্টার : বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী ও বিএসপির ২১৪ তম মাসিক সাহিত্য সভা উপলক্ষে শুক্রবার (৩ জুন) সকালে প্রেসক্লাব যশোরে কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদ (বিএসপি) যশোর আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমান। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বিশিষ্ট কলামিস্ট আমিরুল ইসলাম রন্টু, কবি ও গবেষক ড. শাহনাজ পারভীন, কবি জিএম মুছা এবং কবি ও গবেষক মো. মনিরুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি কবি আহমদ রাজু।

বিএসপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মুন্নার পরিচালনায় কবিতা পাঠ ও আলোচনায় অংশ নেন, আমির হোসেন মিলন, আহমেদ মাহাবুব ফারুক, কাজী নূর, হোসেন উদ্দিন, জাহিদুল যাদু, রাশিদা আখতার লিলি, সুমন বিশ্বাস, মহব্বত আলী মন্টু, অরুণ বর্মণ, অ্যাড. মাহমুদা খানম, রেজাউল করিম রোমেল, শহিদুজ্জামান মিলন, সীমান্ত বসু, সাধন কুমার দাস, নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

আগামী ১ জুলাই ২১৫ তম মাসিক সাহিত্য অনুষ্ঠিত হবে বলে সভায় জানানো হয়।

ভালোবাসা- জোবায়েল হোসেন

যদি ভালোই বাসো

তবে কেন মনের মাঝে এতটা ভয়!

ভালোবাসার জন্যই তো মানুষের জীবন

ভয় মানুষের জীবনে ভালোবাসার অবক্ষয়।

এই পৃথিবীতে যত সৃষ্টি আছে,

এর সব কিছুই ভালোবাসার জন্য,

ভালোবাসা সৃষ্টি কে অনন্য করে তুলে

আবার ভালোবাসাই মানুষকে করে ধন্য।

মনের মাঝে ভালোবাসা থাকলে

মানুষের দুঃখে মানুষ কাঁদে,

বুকের মাঝে অজস্র ভালোবাসা নিয়ে

একটা মানুষ ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও  হাসে।

ভালোবাসাহীন মানুষের জীবন

আষ্টে পৃষ্ঠে আঁধারের,

যে মনে বিন্দু মাত্র ভালোবাসা নেই

সে মনটা শেয়াল কুকুরের।

যে মানুষ গুলো  ভালোবাসতে জানেনা

সে মানুষেরাই পৃথিবীতে ধ্বংস স্তুপ গড়ে,

যে মানুষ ভালোবাসতে জানে

সে মানুষ গুলোই পৃথিবীতে ভালো কর্ম করে।

ভালোবাসার অমুল্য প্রাপ্তি

মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে যায় সুখের ধারে,

ভালোবাসা পেলে দুর্বল  মানুষ ও

শত বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে আপন লক্ষ্যে পৌছাতে পারে।

এই পৃথিবীতে মানুষের কাছে

ভালোবাসার নানান রকমের প্রকার ভেদ,

ভালোবাসার জন্যে কেউ দুনিয়া গড়ে

আবার কেউ আবাদ করে আখিরাতের খেত।

জোবায়েল হোসেন, সিংগাপুর।

ড. শাহনাজ পারভীনের জন্মদিন পালন

মো. মোস্তাফিজুর রহমান : সাড়ম্বরে পালিত হয়েছে বিশিষ্ট কবি ও গবেষক ড. শাহনাজ পারভীনের জন্মদিন। আনুষ্ঠানিক ভাবে অগ্নিবীণার কেন্দ্রীয় সংসদ শনিবার বিকালে নিজস্ব কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে।এছাড়া কবির জন্মদিনে শুভেচছা জানিয়েছেন ভক্তবৃন্দরা।

বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য ড. শাহনাজ পারভীন একজন সব্যসাচী লেখক। সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার রয়েছে বিনম্র বিচরণ। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গবেষণা, কলাম, কিশোর কবিতা, ছড়া, গান সব বিষয় নিয়েই তিনি বিরামহীন লিখে চলেছেন। নব্বই দশকের শক্তিমান এই কবি ১৯৬৮ সালের ৭মে ফরিদপুর জেলার কামার খালীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মো. বজলুর রহমান, মাতা সামসুন্নাহার ফুল এবং স্বামী মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী।

কবি বর্তমানে তালবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজ, যশোরে অধ্যক্ষ হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অগ্নিবীণা কেন্দ্রীয় সংসদ, যশোর এর সম্মানিত সভাপতি এবং দ্যোতনা, নান্দনিক ধারার সাহিত্য কাগজ, যশোর ছড়াঘর: ছড়া সাহিত্যের কাগজ, যশোর এর সম্পাদক।

তাঁর বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে প্রদোষ বেলার চিৎকার (কাব্যগ্রন্থ)-২০০১; জলপ্রপাতের জীবন্তিকা (গল্পগ্রন্থ)-২০০৩; সুখপাখিদের হসপিটাল (উপন্যাস )-২০০৬; নতুন সূর্যের আগমনী গান (প্রবন্ধ গ্রন্থ)-২০০৭; নারী ও বৃক্ষের কাব্য (কাব্যগ্রন্থ)২০০৭; প্রেমের কবিতা (কাব্যগ্রন্থ)-২০০৮; অতল নৈঃশব্দ্য (কাব্যগ্রন্থ )-২০১০; ইসলামে নারী অধিকার ও অবস্থান (গবেষণা)২০১০ গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা; মুক্তিযুদ্ধ কবিতা ও কথাশিল্প (প্রবন্ধ) ২০১১ খ্রি.; স্বপ্ন শুধু উড়ালপঙ্খি (কিশোর কবিতা) ২০১১ খ্রি.; নির্বাচিত কবিতা (কাব্যগ্রন্থ) ২০১১ খ্রি.; শাহনাজ পারভীনের ত্রয়ী উপন্যাস (উপন্যাস) ২০১৩ খ্রি.; একাত্তরের আগুন সময় (গল্পগ্রন্থ) ২০১৭ খ্রি.; সামীপ্য সুধা (কাব্যগ্রন্থ)২০১৭ খ্রি.। সূর্য ও পৃথিবীর গান (গীতিগ্রন্থ) ২০১৮ খ্রি.। প্রোমিসড প্রফেট (মহাকাব্য) ২০১৯ খ্রি.; নীলনদের আাখ্যান (গবেষণা উপন্যাস)২০২০ খ্রি.; কবি গোলাম মোস্তফা: জীবন ও সাহিত্য (গবেষণা) ২০২০ খ্রি, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ঢাকা। শিক্ষার নতুন দিগন্ত (প্রবন্ধ) ২০২১ খ্রি.; স্বপ্ন মেঘের সাগর বেলায় ( কিশোর উপন্যাস) ২০২১ খ্রি. ; বিভোর রাত্রিদিন (কাব্যগ্রন্থ) ২০২২; রুদ্ধদিনের শব্দসম্ভার ( মিশ্র রীতির সাহিত্য) ২০২২ খ্রি. এবং নাম্মীর বাসা (শিশুতোষ গল্প) ২০২২ উল্লেখযোগ্য।

ড.শাহনাজ পারভীন শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক: বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস)।

জীবন সদস্য: বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা; যশোর ইনস্টিউট পাবলিক লাইব্রেরী, যশোর; শিল্পকলা একাডেমী, যশোর; বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, যশোর জেলা শাখা; বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদ, যশোর।

কার্যনির্বাহী সদস্য, আর আর এফ, যশোর। উপদেষ্টা: প্রথম আলো বন্ধুসভা, যশোর জেলা শাখা, উপদেষ্টা: শেকড়, যশোর: উপদেষ্টা: বাচিক শিল্পী সংঘ, কেন্দ্রীয় সংসদ, যশোর। উপদেষ্টা: কৃষ্টিবন্ধন

যশোর জেলা শাখা, যশোর ও লেখক কেন্দ্র, যশোর। “প্রোমিসড প্রফেট” মহাকাব্যের কবি তাঁর সাহিত্য, সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ

অবদান রাখায় দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন পুরষ্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা রইলো।

নিপীড়িত মানুষ-রমা চক্রবর্তী

আমরা কোন দলে পরি?

সামনে না পিছনে?

আগে না পরে?

উপড়ে নাকি নীচে কোনদিকে?

আমরা তো প্রভেদ ভুলে গেছি

শোষক আর শোষিতের

তাই এখনও চোখ মেলে দেখি

স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়েও

সাত বছরের শিশু পাথর ভাঙে

এঁটো বাসন ধোয় চায়ের দোকানে

শিশু শ্রম চলে অবিরত কয়লা খাদানেও

তবুও আমরা মুখ বুজে থাকি

নাহলেই এ-দল ও-দলে টানাটানি

আসলে আমরা তো জানিই না আমরা কোন্ দলে পরি?

এখনও ভাতের থালায় যাদের জোটে না দুমুঠো অন্ন

তারা এ-দল ও-দলে টানাটানি

রোদের ছায়া ক্রমশ ছোটো হয়ে যাচ্ছে

মাঠ ক্রমশ ছোটো হয়ে যাচ্ছে

আমরা সবাই বুঝেও বুঝি না

আসলে আমরা জানিই না আমরা কোন্ দলে পরি?

খেজুর চিনি-ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমান

বগুড়া সরকারী আযিযুল হক কলেজে একসময় আমি বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগ দিয়েছিলাম। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এতোটা উন্নত ছিলনা। যশোর থেকে ট্রেইনে এরপর বাসে যোগে বগুড়া জেলা শহর। আমি দূরবর্তী দুর্গম এলাকার মানুষ হিসেবে সহকর্মীদের কাছে বিবেচিত হতাম।

একদিন সমবয়সী কয়েকজন সহকর্মী প্রস্তাব দিলো সন্ধ্যায় বাজারে যেতে হবে। গুড় পাটালির দোকানে যশোরের উন্নতমানের পাটালি পাওয়া যায়। যশোরের পাটালি আর বগুড়ার মুড়ি দিয়ে সান্ধ্য উৎসব পালিত হবে। যাদের সাথে গেলাম; একজন নিজামউদ্দিন, অন্যজন ফারুক আহমেদ। কালীতলা বাজার একদিকে কালী মন্দির আর অল্প দূরত্বে রয়েছে একটি মসজিদ। মাঝখানে বাজারের একটি অংশে গুড় পাটালি। দশবারোবি গুড় পাঠালির দোকান। মনে হলো, হিন্দু-মুসলিম গুড়ের বন্ধনে এখানে আবদ্ধ রয়েছে। সহকর্মীদের দুই একটি পরিচিত দোকান। আমাদের দেখে খুব ডাকাডাকি শুরু করলো। স্বল্প দূরত্বে মন্দির আর মসজিদ। উন্নতমানের পাটালি, যশোরের পাটালি, বাংলাদেশের বিখ্যাত পাটালি। তারা খুব কোলাহল করে উঠলো। কাছের একটি দোকানে আমরা পৌঁছলাম। সহকর্মী নিযামউদ্দিন দোকানদারকে বললেন আমাকে দেখিয়ে:

        : ইনাকে চিনো।

        : না স্যার। উনাকে তো আমরা চিনবার পাইল্লাম না।

        : দেখতো খেয়াল করে।

চেষ্ঠা করলো কিন্তু আমাকে চিনতে পারলো না। তারা যশোরের লোক চিনতে না পারলেও যশোরের পাটালি খুব চিনতে পারে। সহকর্মীরা আমার পরিচয় দিয়ে বললেন:

: উনি যশোরের মানুষ। যশোর থেকে এসেছেন। আযিযুল হক কলেজে যোগ দিয়েছেন। দোকানদাররা সবাই নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে গেল। আমি কৌতুহলি হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

: এগুলো যশোরের কোন এলাকার পাটালি। আপনারা অনেক কষ্ট করে দূর থেকে পাটালি নিয়ে এসেছেন। দোকানদাররা কেমন অপ্রস্তুতবোধ করতে থাকলো। একজন বিক্রেতা সবিনয়ে বললো;

: স্যার। পাটালি আসলে যশোরের থেকে আসেনি। যশোরের কথা বললে বিক্রিটা খুব ভালো হয়। যশোরের পাটালির অনেক চাহিদা। 

যশোরের খেজুর গুড় আর পাটালি ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। যশোর ছাড়াও বাংলাদেশের অনেক জেলাতে খেজুরের রস, গুড়, পাটালি উৎপন্ন হয়ে থাকে। বগুড়া, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, খুলনা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মাগুরা, মাদারিপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ অঞ্চলে খেজুর রসের ও গুড় পাটালির উৎপাদন চলছে ব্যাপক ভাবে। তবে আগের মত কোনো জেলাতেই আর হচ্ছে না।

ছেলেবেলাতে শীতের একটি বিশেষ আনন্দ ছিল সকালে খেজুরের রস। শীতের প্ররম্ভে নতুন রস, গুড় আর চিনির বিশেষ ঘ্রাণ ছিল। তাকে বলা হতো নলেন পাটালি।

প্রতিদিন সকালে খেজুরের রস আর মচমচে মুড়ি। রস মুড়ি আর নলেন পাটালির স্বাদ এখন আর পাওয়া যায় না। তবে তা ভোলাও যায় না।

        নলেন গুড় পাটালি আত্মীয় বাড়ি পাঠানোর একটা রেওয়াজ ছিল। বাড়িতে এলে আত্মীয় স্বজনকে পরিবেশন করা হতো কাচা রসের ক্ষীর। পল্লীগীতির অবিস্মরণীয় শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠের গান মনে পড়ে: “কৈ গেলিলো লো ট্যানার মা কাচা রসের ক্ষীর পাকাইলাম খাইয়া গেলিনা।”

        খেজুরের গুড়, পাটালির বিখ্যাত বিক্রয় কেন্দ্র ছিল যশোর জেলার খাজুরা বাজার। ছাতিয়ানতলার হাট, মণিরামপুর এবং কেশবপুর বাজার। গ্রামের কৃষিজীবীদের প্রায় প্রতিটি সংসারেই খেজুরের গুড় পাটালির তৈরির ব্যবস্থা ছিল। ছাতিয়ানতলায় সপ্তাহে দুইবার হাট বসতো, বৃহস্পতিবার আর রবিবার। এই দুটি দিন ছিল উৎসবের মতো। অনেক কৃষিজীবী গরুর গাড়িতে গুড়, পাটালি, কলাই, মুসুরি বোঝাই করে নিয়ে যেতো ছাতিয়ানতলার হাটে।

বিক্রির পর বড় আকৃতির মাছ, খাসির গোশতো, তাজা তরকারি এবং মিষ্টির হাড়ি ক্রয় করা হবে। রান্নার ঘ্রাণে আর ভোজনরসিকদের আনন্দ কোলাহলে মুখরিত চারদিক। পরিতৃপ্তির আহার শেষে আবার গরুর পরিবহনে তাদের ঘরে ফেরা। অনেকের কণ্ঠে ধ্বণিত হতো আব্বাস উদ্দিনের সুর সুধা: “ও কি গাড়িয়াল ভাই কত রবো আর পন্থের দিকে চাইয়া।” এইসব আনন্দধ্বণি স্মৃতির পাতায় গুঞ্জন তোলে, জীবনে তা আর নেই।

খেজুরের রস জ্বালানোর পর গুড়ে ফোট ধরে। তারপর জাতি দিয়ে ঘসে ঘসে বিজ মারার পর বড় আকৃতির মাটির নান্দায় ঢেলে দেয়া হতো। তারপর গুড় জমে দানা তৈরি হলে নান্দার উপরে পাটা শেওলা দিয়ে তলা ফুটো করে দিলে তরল গুড় নিচের পাত্রে ঝরে যেতো নান্দায় জমে থাকতো চিনি। কেশবপুর, মনিরামপুর, রাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে খেজুর চিনি তৈরি হতো। মনিরামপুর থেকে সড়কপথে পাঁচ মাইল দূরে রয়েছে একটি বাজার: চিনি টৌলা বাজার। খেজুর চিনি থেকে এই নামকরণটি হয়েছে। এখন চিনি টৌলা বাজার রয়েছে চিনি নেই।

কৃষি নির্ভর গ্রামীণ জীবনের প্রতিদিন সকালের নাস্তা ছিল পান্থাভাত, খেজুরের গুড়, চিনি তার সাথে নারকেল কোরা। বৈশাখি উৎসবে পান্থা ইলিশের বদলে পান্তা, গুড় আর নারকেল পরিবেশিত হওয়া উচিত। খেজুর চিনি উৎপাদনের বিষয়াদি বাংলাদেশ সরকারের কৃষি বিভাগ ভেবে দেখতে পারে।

প্রজ্বলিত পথচারি-নূরজাহান আরা নীতি

জীবনের আকাশ মেঘে ঢাকলেও

থমকে দাঁড়াবে না,

এক ফোঁটা চোখের জ্বালও ফেলবে না।

ভোরের অপেক্ষা-

সূর্য উঠলে মেঘ কেটে যাবে,

স্রষ্ঠা তাঁর সৃষ্টিকে রক্ষা করবে।

তোমার ভালোবাসায় যদি পূর্ণতা থাকে,

নতুন জীবনে পৃথিবী তোমাকে দেবে পরিপূর্ণতা।

তুমি নও একা, তোমার অপেক্ষায় পৃথিবী

অগণিত মানুষ সময়ের দ্বিপ্রহর গুণছে,

সভ্য সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে

সোচ্চার হবে প্রতিবাদ।

বন্ধু, বোঝ আর নাইবা বোঝ?

সে পথের সাথী ছিলাম, আছি, থাকবো

নাইবা পেলাম সুরভিত ফুল,

পেয়েছি সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।

এখন আমি প্রজ্বলিত পথচারি-

খোলা আকাশ। নীল রঙের শাড়ি,

প্রশান্তর অফুরন্ত সুখ,

সব-সব, সব কিছু তোমাদের

স্কুটি-জাহিদুল যাদু

জিন্স আর টপস্ পরে শেলী যখন স্কুটিতে বসে ড্রাইভ করে সে মাইরি দেখার মতো দৃশ্য! কানাগলিতেও জমজমাট ভীর জমে যায় মর্ডান মালটাকে একনজর দেখবে বলে। ছেলে-ছোকড়ার কথা তো বাদই বুড়োদের পর্যন্ত জিভ বেরিয়ে লালা ঝরে। শেলীর ছেলে বন্ধুরা এক-একজন, এক-একদিন স্কুটির পেছনে উঠে স্বর্গের সুখ লাভ করে। থিয়েটার, সিনেমা, পার্কে নিত্যনতুন বয়ফ্রেন্ডকে দে-দারছে প্রতিদিন ভাঙিয়ে ফকির করে দেয় শেলী। শহরের সেরা সেরা সুন্দরীরাও আড়চোখে স্কুটি সুন্দরীর লাইফস্টাইলে ফিদা হয়ে যাচ্ছে…

বিকেল থেকে বর্ষা বাড়তে লাগলো। শেলী বয়ফ্রেন্ড ফুয়াদের রুমে বসে চানা আর হুইস্কি খাচ্ছে। ফুয়াদের ভরপুর নেশা হয়ে গেছে! লাল চোখে সে তাকিয়ে আছে শেলীর অপূর্ব ঘোর লাগা চোখে।

রাত দশটায় রহিম শেখ, শেলীর বাবা; সিগারেট হাতে এমাথা-ওমাথা ব্যালকনি চষে বেড়াচ্ছেন। শেলীর মা হাসিনা, নর্দান ক্লিনিকে অপারেশন রূমে। আজ হাসিনা শেখের পিত্তথলির পাথর অপসারণ করা হয়েছে। দুপুরে চল্লিশ হাজার টাকা বাবার হাতে দিয়ে শেলী সেজেগুজে বের হয়েছে। রহিম শেখ রিটায়ার্ড করার পর তিন কন্যার বড়োজন শেলী-ই সংসারের হাল ধরেছে। রহিম শেখ সব বুঝেশুনেও চুপ করে থাকেন,  তাকে চুপ থাকতে হয়!

রাত বারোটার দিকে পুলিশের জীপ এসে বাসার গেটে দাঁড়ালো। একজন এস আই কলিং টিপতেই বেরিয়ে এলেন রহিম শেখ। শান্তভাবে জানতে চাইলেন কি হয়েছে? এস-আই রমেজ তারো অধিক শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো শেলী কি আপনার মেয়ে? রহিম শেখ প্রায় হিতাহিত শূণ্য হয়ে উত্তর দিলেন, জ্বি….

আমরা শেলীর লাশটি পোস্ট মর্টেমের জন্য সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছি ।  আগামিকাল দুপুর একটা নাগাদ লাশটি রিসিভ করবেন।রহিম শেখ কাটা কলাগাছের মতো দড়াম করে মেঝেতে পড়ে গেলেন। এস-আই রমেজ হাঁটু ভাঁজ করে বসে রহিম শেখের কাঁধে হাত রাখলেন, শান্ত হোন মুরুব্বী আমরা ফুয়াদ আর ওর তিন বন্ধুকে আটক করেছি যারা গণধর্ষণ করে হত্যা করেছে শেলীকে।

কবি ও মৃত্যু-মহুয়া ব্যানার্জী

ফসল কাটা শেষ হলে মাঠের বুকে খরা।

প্রকৃতির রস শুষে নিয়ে মৃতপ্রায় চাষী

স্বপ্ন দেখে পেট ভরা ভাত আর নতুন কাপড়ের-

কবিরা বাণিজ্যে বেরোয় মৃত্যুকে পণ্য

করে যদি দু একটা কবিতা বেচা যায়-

অনুদান ঢেকে দেয় প্রতিবাদী স্বর।

ফ্যাকাশে ঋতুরা নিস্পত্র, নির্বাক।

বাংলার ঝরা পাতায় তখনও কবিতা লেখা হয়…

মিছিলের মত কবিতারা হেঁটে যায় রাজপথে-

রাজ রোষ খরতাপ হয়ে পুড়িয়ে দিতে চায়-

তবুও মৃত্যুর ঘ্রাণ বুকে নিয়ে শহরের

রাজপথে শুয়ে স্বপ্ন দেখে হৈমন্তিক কবি-

ছেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশায় ভিজে যায় অস্তিত্বের ট্রামলাইন-

বাংলার কাক পেঁচা ফসলের রঙ সব

নিয়ে তখনই  বেঁচে ওঠে কবিতা যাপন।

সমস্ত কবিতারা রোদ হয়ে খেলা করে কবির শরীরে।

অমানুষের গল্প-রেজাউল করিম রোমেল

নাম মোঃ রকি হাসান। সবাই রকি নামে চেনে। এবং রকি নামে ডাকে। রকির শিশুকাল কেটেছে ঢাকার কোন এক বস্তিতে তার খালার বাড়িতে। শিশু বয়সে রকি দেখত চার পাঁচ জন লোক তার খালা খালুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে যেত। যদি খালা খালু ওই চার পাঁচ জন লোক কে টাকা না দিত তাহলে মারধর করতো। জোর করে টাকা নিয়ে যেত। টাকা না পেলে ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে যেত। আর বলতো,

“ আসলাম ভায়ের আস্তানায় টাকা দিয়া তর ঘরের জিনিস পততর লইয়া আইছ। ”

শুধু যে রকির খালা খালুর সাথে এমন ব্যবহার করতো তা নয়। লোকগুলো বস্তির সবার কাছ থেকেই টাকা নিত। আর টাকা না দিলে মারধর করতো। জোর করে বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে যেত।

আসলাম ভায়ের কথা শুনলে বস্তির সবাই ভয় পেত।

রকি দু একবার দেখেছে আসলাম ভাই-কে। সাদা পাগড়ি, সাদা পাঞ্জাবি, সাদা লুঙ্গি এবং পায়ে থাকতো সাদা জুতো। রকি যে কয়দিন আসলাম ভাই-কে দেখেছে সাদা পোশাকেই দেখেছে। রকি তার খালার কাছে ভাত চায়লে মাঝে মধ্যে খালা খুব মারধর করতো। তাই সে সবসময় স্বপ্ন দেখতো সেও একদিন আসলাম ভাই হবে। কারণ আসলাম ভাই হতে পারলে সবাই তাকে ভয় পাবে। ভাত খেতে চায়লে তার খালা তাকে আর মারধর করবে না। রকির খালু ঢাকা শহরে রিক্সা চালায়। আর খালা মানুষের বাড়িতে কাজ করে। খালার দুই ছেলে এক মেয়ে। রকি তার খালাতো ভাই বোনদের থেকে বয়সে বড়। রকির জন্মের আগে রকির বাবা নিখোঁজ হয়। আর মা রকির জন্মের কিছুদিন পর এক অজানা রোগে মারা যায়। এরপর থেকে সে খালার বাড়িতেই থাকে।

রকি সাত আট বছর বয়স থেকে চায়ের দোকানে কাজ করতো। তৈরী করা গরম চা বিভিন্ন দোকানে বা অফিস আদালতে নিয়ে যেত এবং চা খাওয়ার পর রকি খালি চায়ের কাপ নিয়ে আসত। চায়ের দোকানে কাজ করার সময় সাপ্তাহিক যে টাকাটা পেত সেটা তার খালু এসে নিয়ে যেত। রকি তার পারিশ্রমিকের একটি টাকাও কোনো দিন হাতে পেত না। মানুষের কাছে চা পৌছে দেওয়ার সময় অনেকেই অনেক আজে বাজে কথা বলতো। কেউ গালাগালি দিত, মারধর করতো। অনেকে বলতো –

“ এই, চা আনতে এতো দেরি হয় ক্যান? ”

কেউ বলতো –

“ এই পিচ্চি চা এতো ঠান্ডা ক্যান? ”

একদিন এক গাড়ির গ্যারেজের মালিকের চা পৌছে দিতে দেরি হওয়ায় সে রেগে গিয়ে রকি-কে বললো –

“ হেই পিচ্চি চা আনতে এতো দেরি হয় ক্যান? এতো দেরি হয় ক্যান? এই কান ধর, কান ধর। ”

লোকটা খুব চিৎকার করে রকি-কে এই কথাগুলো বলতে লাগল। আর রকি লোকটার কথামত কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর গাড়ির গ্যারেজের মালিক চায়ে চুমুক দিয়ে বললো –

“ এই চায়ে এতো চিনি দিছোছ ক্যা? এই; এইডা কি চা বানায়ছোছ? ”

রকি বললো –

“ চা তো আমি বানাই নাই ভাই। রবিউল ভাই চা বানায়ছে। ”

লোকটা আরো ক্ষেপে গিয়ে বললো –

“ তুই আমার মুখে মুখে তর্ক করছ। এদিক আয়, এদিক আয়। ”

লোকটি রকি-কে তার কাছে ডেকে নিয়ে বললো –

“ তোর চা এতো ঠান্ডা ক্যা। ”

কথাটা বলতে বলতে লোকটি তার হাতে থাকা গরম চা রকির মাথায় ঢেলে দিল। তারপর বললো –

“ যা ভাগ। তোর চায়ের কোনো টাকা হইব না। ”

রকি কাঁদতে কাঁদতে চায়ের কাপ নিয়ে চলে যেতে লাগল। হটাৎ-ই তার চোখে পড়ল একটা মোটা এবং লম্বা রড। রকি রডটা উঠিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর দৌড়ে গিয়ে গাড়ির গ্যারেজের মালিকের মাথায় জোরে বেশ কয়েকটা আঘাত করল। ফলে লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মাথায় হাত দিয়ে দেখল তার মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে। সাথে সাথে সে চিৎকার করে বললো –

“ এই ক্যাডা আছোছ ওই পিচ্চিডারে ধর। ও আমার মাথা ফাডাইয়া দিছে। ”

রকি কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। সে ডানে বামে দু একবার তাকিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করল।আর রকির পিছনে গ্যারেজের কর্মচারীরা দৌড়াতে লাগল তাকে ধরার জন্য। কিন্তু তাকে ধরতে পারল না। তারপর ওইদিন রাত নয়টার দিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পোস্তগোলা ব্রিজের নিচে বসে ছিল। সে বাড়ি ফিরবে কি করে বুঝতে পারছে না। সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি। হটৎ-ই সে দেখল চার পাঁচ জন লোক দুজন লোককে ঘিরে ধরেছে আর বলছে –

“ এই যা আছে তাড়াতাড়ি দিয়া দে। ” 

রকি বুঝতে পারল চার পাঁচ জন লোক যারা দুই জন লোককে ঘিরে ধরেছে তারা ছিনতাইকারী। লোকগুলো ছিনতাই করে যাওয়ার সময় দেখল অন্ধকারের ভিতরে একটি ছেলে  বসে আছে। লোকগুলোার ভেতর থেকে একজন বললো,

“ ওই দ্যাখ। ওইখানে একটা বাচ্চা পোলা বইয়া রইছে না? চলতো গিয়া দেহি! ”

রকির কাছে গিয়ে বললো,

“ এই তুই ক্যাডারে? এতো রাতে এইহানে কি করছ? ”

ছিনতাইকারী লোকগুলোর মধ্যে আর একজন বললো,

“ ভাই এই পোলাডারে আমি চিনি। আমাগো পাশের বস্তিতে থাহে। নাম রকি। আইজ ওই পাড়ার গ্যারেজের মালিকের মাথা ফাটাইয়া দিয়া এইহানে বইসা রইছে। ”

“ কছ কি? তুই এইটুক একখান পিচ্চি পোলা হইয়া গ্যারেজের মালিকের মাথা ফাটাইয়া দিছোছ? চল আমাগো লগে চল। ওই ওরে আমাগো লগে লইয়া আয়। ”

লোকগুলো রকিকে আরমান ভায়ের আস্তানায় নিয়ে গেল। রকি আরমান ভাই-কে দেখল এবং মনে মনে বলতে লাগল তাহলে এই সেই আরমান ভাই। যার নাম শুনলে সবাই ভয় পায়। লোকটি দেখতে কালো। কালো গোঁফ। সাদা পোশাক পড়া। একটি রাজকীয় চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললো,

“ কি রে কাজ হইছে ঠিক মতন? ”

ছিনতাইকারী লোকগুলোর মধ্য থেকে সাইফ বললো,

“ জ্বী ভাই। ”

“ তাইলে টাকা গুলান মানিক্যার কাছে রাইখা যা। কালকা আইছ। ”

হটাৎ করে আরমান ভাই রকির দিকে তাকিয়ে বললো,

“ এই পিচ্চি পোলাডা ক্যাডারে? ”

সাইফ বললো,

“ ভাই এ্যার নাম রকি। এক গ্যারেজ মালিকের মাথা ফাটাইয়া পোস্তগোলা ব্রীজের তলে পালায়য়া ছিল। ”

“ আচ্ছা ঠিক আছে। ওরে রাইখা যা। ”

লোকগুলো রকি-কে আরমান ভায়ের কাছে রেখে চলে গেল। আরমান ভাই রকি-কে ডেকে বললো,

“ এই পোলা তোর নাম কি? ”

“ রকি। ”

“ তুই এক ব্যাটার মাথা ফাটাইয়া দিছোছ? ”

“ হ ”

“ ক্যা? ”

“ হ্যায় আমার মাথায় গরম চা ঢাইলা দিছিল। ”

“ও এই কথা। আচ্ছা ঠিক আছে তুই অহুন থ্যাইককা আমার কাছে থাকবি। তরে কেউ কিছু কইতে পারব না। আমার কাছে আয়। আমার পা দুইখান টিইপপা দে। ”

রকি আরমান ভায়ের কাছে গিয়ে তার পা টিপে দিল।

আরমান ভাই অনেক ক্ষমতাবান। তার মূল কাজ হল মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল ইত্যাদি। আর তার এই কাজ করার জন্য সে পুলিশকে প্রতিমাসে টাকা দেয়। তার এই অপকর্ম যেন সে ঠিকমত করতে পারে সেজন্য প্রতিমাসে যে টাকা দেয় তা মন্ত্রী লেবেল পযন্ত যায়। তাই তার কাজে কেউ বাঁধা দিতে পারে না। তার লোকবলও অনেক। এজন্য সবাই আরমান ভাইকে ভয় পায়।

কিছুদিন হল রকির কোনো খোঁজ নেই। রকির খালা খালু দু তিনদিন খুঁজাখুঁজির পর এখন খুঁজাখুঁজি করা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা ভেবেছে রকি হয়তো কোথাও চলে গিয়েছে, আর হয়তো ফিরে আসবে না। হটাৎ একদিন রকি তাদের বস্তিতে এসে হাজির। তার খালা বাড়ি এসে খালাকে ডাকল,

“ খালা, ও খালা তুমি কই? ”

খালা ঘর থেকে বেরিয়ে চিৎকার করে বললো,

“ রকি, তুই এতোদিন কই আছিলি? আহাম্মকের পোলা আহাম্মক। তুই বাপের বয়সি একজন মানুষের মাথা ফাটাইছোছ। ও ব্যাটা তোরে পাইলে মাইরা ফালাইব। ”

“ খালা তুমি আস্তে কথা কও, বেশি চেঁচাইয়ো না। আমি অহন ওই গ্যারেজের মালিকের লগে কথা কইয়া আইলাম। আমি আরমান ভায়ের লগে কাম করি। এহন আমি তার সহকারী। আরমান ভাই ওই গ্যারেজের মালিক ব্যাটার লগে আমার ঝগড়া বিবাদ মিমাংসা কইরা দিছে। কিছু বুঝছো? ”

খালা চোখে ভয় নিয়ে মুখে হালকা হাসি দিয়ে বললো,

“ হ…   হ…  হ… বাবা ভাল আছি। আয়, বয়, ভাত খাইয়া যা। ”

খালার কথামত রকি খেতে বসে গেল। খালা তাকে অনেক যতœ করে খাওয়াল। আর আস্তে আস্তে রকির কানের কাছে গিয়ে বললো,

“ আমাগো ব্যাপারটা দেহিছ। আরমান ভাই-রে কইবি আমাগো কাছ থেইকা যেন চাঁদা না লয়। ”

“ আচ্ছা কমুনে। ”

রকি মনে মনে ভাবতে লাগল মাস দেড়েক আগে সে খালার কাছে ভাত খেতে চাইলে বকাবকি করতো। অনেক দিন ছিল ভাত খেতে দিত না। আজ সেই খালা তাকে যতœ করে ভাত খেতে দিচ্ছে। সে যদি আরমান ভায়ের মত হতে পারে তাহলে শুধু তার খালা কেন সবাই তাকে ভয় পাবে।

রকি আরমান ভায়ের কাছে থেকে অনেক অবৈধ কাজ করতো। ছিনতাই, অবৈধ মালপত্র আনা নেওয়া, মাদক দ্রব্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়ে আসা ইত্যাদি কাজ করতো। এসব কাজ করতে গিয়ে রকি অনেক সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলও খেটেছে। আরমান ভায়ের লোক হওয়ার কারনে জেল হাজত রকিকে আটকে রাখতে পারেনি। আরমান ভায়ের নির্দেশে রকি অনেক মানুষও খুন করেছে।

দেখতে দেখতে বার তেরটা বছর কেটে গেল। রকি এখন বয়সে তরুণ। এবং আরমান ভায়ের একজন বিশ্বস্ত লোক। ইদানিং আরমান ভায়ের একজন প্রতিদ্বন্দী তৈরী হয়েছে। নাম জাহাঙ্গীর। আর তাই আরমান ভাই রকি-কে বললো সে যেন জাহাঙ্গীরকে খুন করে । যাতে আরমান ভায়ের রাস্তা পরিস্কার হয়ে যায়। এবং সে যেন আগের মত তার কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারে। রকি একদিন সুযোগ বুঝে জাহাঙ্গীরকে গুলি করে হত্যা করার চেষ্টা করল। কিন্তু রকি জাহাঙ্গীরকে হত্যা করতে পারল না। রকি যখন গুলি চালাল তখন গুলিটা জাহাঙ্গীরের হাতে লাগল। তারপর জাহাঙ্গীরের সাথে থাকা লোকজন রকি-কে ধরে ফেললো। এবং জাহাঙ্গীরের আস্তানায় নিয়ে গেল।

তারপর জাহাঙ্গীর ভাই রকিকে বললো,

“ আমারে মারোনের ল্যাইগা আরমান ভাই তোমারে কত টাকা দিছে? ”

রকি জাহাঙ্গীর ভায়ের কথার কোনো উত্তর দিল না। তখন জাহাঙ্গীর ভাই রেগে গিয়ে রকির মুখে জোরে একটা চড় দিয়ে বললো,

“ ঠিক ঠিক উত্তর দে। না হইলে কিন্তু তরে মাইরা ফালামু। ”

রকি বললো,

“ হ টাহা দেয় ”

“ কত টাহা দেয়? ক। না হইলে কিন্তু তরে মাইরা হালামু। ”

“ এক একটা মানুষ খুন করতে কখনো এক লাখ আবার কখনো দেড় লাখ টাকা দেয়। ”

“ আমারে মারোনের লাইগা আরমান তরে কত টাকা দিতে চায়ছে? ”

“ আমারে কিছু বলে নাই। ”

“ তোর আরমান ভাই তোদের মত রকির ঘাড়ের উপর হাত দিয়া আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। বাড়ি করছে গাড়ি করছে। আর তুই কি করছোছ? তোর কি আরমান ভায়ের মত হইতে ইচ্ছা করে না? আরমান ভাই বাঁইচা  থাকলে তুই তার জায়গা ক্যামনে দখল লইবি? তুই আরমান রে মাইরা ফালা। তাইলে আরমান ভায়ের এলাকা তোর দখলে চইলা আইব। আর তোরে আমি হেল্প করুম।এই নে একলাখ টাকা। আরমান ভাইরে মারতে পারলে আমি তরে পাঁচ লাখ টাকা দিমু। এই ল ধর। ”

রকি জাহাঙ্গীর ভায়ের কাছ থেকে একলাখ টাকা নিয়ে সোজা আরমান ভায়ের আস্তানায় গিয়ে সরাসরি আরমান ভায়ের রুমে ঢুকে রুমের দরজা বন্ধ করে দিল।

আরমান ভাই বললো,

“ কিরে এতো ব্যস্ত ক্যান? কামডা করতে পারছোছ? জাহাঙ্গীররে মাইরা হালাইতে পারছোছ?

রকি বললো,

“ না ”

“ তাইলে? ”

“ আমি আপনারে মারতে আইছি। ”

আরমান ভাই বিস্ময়ের চোখে রকির দিকে তাকিয়ে বললো,

“ এই তুই কি কছ? তুই কছ কি? ”

“ হ। আমি আপনারে মারতেই আইছি। আপনারে মারতে পারলে জাহাঙ্গীর ভাই আমারে পাঁচ লাখ টাকা দিবো কইছে। সে আমারে এক লাখ টাকা আগেই দিছে। আমার জীবনে একটাই স্বপ্ন আমিও আপনার মতন আরমান ভাই হইতে চাই। আপনার জায়গা দখল করতে জাহাঙ্গীর ভাই আমারে সাহায্য করব। ভাই আমারে মাফ কইরা দিয়েন। ”

আরমান ভাই এ কথাগুলো শুনে চোখ দুটো বড় বড় করে মুখ হা করে রকির দিকে তাকিয়ে থাকল। আর রকি তার মাযা থেকে পিস্তলটা বের করে আরমান ভায়ের বুকে দুই তিনটা গুলি করল। রুমের বাইরে থাকা লোকজন গুলির শব্দ আর চিৎকার শুনে আরমান ভায়ের রুমে এসে ঢুকল। আরমান ভায়ের রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে সবাই অবাক হল।

আরমান ভাই বললো,

“ দাড়াইয়া কি দ্যাহছ? রকিরে ধর। ও আমারে গুলি করছে। ”

রকি অবস্থা বুঝে আরমান ভায়ের ঘরের দরজা খুলে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করল। আর আরমান ভায়ের লোকেরা রকিকে ধরার জন্য তার পেছনে দৌড়াতে লাগল। আর চিৎকার করে বলতে লাগল,

“ রকিরে ধর। ও আরমান ভাইরে গুলি করছে। ”

একটা সময় লোকগুলো রকিকে উদ্দেশ্য করে গুলি করতে শুরু করল। তাদের করা দুটো গুলির একটা রকির পায়ে আর একটা পিঠে লাগল। এবং সাথে সাথে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যন্ত্রনায় ছটফট করে চিৎকার করতে লাগল। লোকগুলো রকির কাছে আসল। তারপর আরমান ভাইকে ফোন দিল। আরমান ভাই বললো,

“ ওরে গুলি কইরা মাইরা ফালা। আর তাড়াতাড়ি আয়। আমার শরীর দিয়া অনেক রক্ত ঝরতাছে। আমারে হাসপাতালে লইয়া চল। ”

“ জ্বী ভাই, আইতাছি। ”

কথাটা বলে লোকগুলোর ভিতরে একজন রকির মাথার উপরে পিস্তল ধরল। যখনিই গুলি করবে ঠিক তখন রাস্তা দিয়ে একটি গাড়ি হর্ণ বাজাতে বাজাতে আসতে থাকে। লোকগুলো দেখল একটা পুলিশের গাড়ি হর্ণ বাজাতে বাজাতে তাদের দিকেই আসছে। তখন তারা রকিকে গুলি না করে দ্রুত দৌড়ে পালালো।

এরপর তিনদিন পার হল। আরমান ভাই এবং রকি দুজনেই হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। আরমান ভায়ের লোক দেখানো কিছু আইনসম্মত ব্যবসা আছে এবং সে রাজনীতির সাথে জড়িত। আর তাই বিভিন্ন পত্রিকায় খবর এলো বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও রাজনীতিবীদ আশিকুর জামান আরমান ওরফে আরমান ভাই নিজের দেহরক্ষী দ্বারা গুলিবিদ্ধ। ধরনা করা হচ্ছে আরমান ভাই তার কোনো শত্রু পক্ষের স্বীকার হয়েছেন। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন। আরমান ভায়ের উপর যে গুলি চালিয়েছিল সেই দেহরক্ষী রকিকেও আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার  করা হয়েছে। বর্তমানে সে পুলিশ হেফাজতে আছে।

রকি পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালের বিছানায় ব্যাথায় ছটফট করছে আর মনে মনে ভাবছে সে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আরমান ভায়ের মত ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে। এবং আরমান ভায়ের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ জাহাঙ্গীর ভাই তাকে সবধরনের সহযোগীতা করবে। জাহাঙ্গীর ভাই তাকে নিজ মুখে বলেছে। ছোট বেলা থেকে যে স্বপ্ন বুকে লালন করে বড় হয়েছে অল্প কিছু দিনের মধ্যে তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। কিছুদিন পর সে-ই হবে ক্ষমতাবান রকি ভাই।