Home » 2022 » May (page 2)

Monthly Archives: May 2022

এক দিনের বাঙালি-সোনিয়া সুলতানা চাঁপা

আমি এক বিশুদ্ধ বাঙালি

মনে প্রাণে ভালোবাসি বাংলাকে

অথচ চোখ মুছতে মুছতে-

চায়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে

বলি- ওয়াও ভেরি গুড

সুগার-লিকার এক দম পারফেক্ট,

সকালের আহার শুরু করে

দুপুর থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত

সব খানে কেবলই চর্চা শুদ্ধ ইংরেজির

অথচ দাবি-মনে প্রাণে আমি বাঙালি,

তাই ফেব্রুয়ারি এলেই মেতে উঠি

কালো সাদার বাহারি উৎসবে

তা হলে অমর একুশে কি শুধুই উৎসবের??

অথচ এ আমার ভাইয়ের রক্তে কেনা শোক আর স্বধীনতার মূর্তপ্রতীক,

তবু চায়ের চুমুকে চুমুকে আপ্লুত হয়ে বার বার বলি- ওয়াও,

তা হলে কি শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর নতুন ভাষা-‘ওয়াও’?

এ ভাবে ভাবনার বীনা তারে

যখন বাজে বিদেশী ভাষার সূর

তখন আমি সত্যিই লজ্জিত,

আমাকে ক্ষমাকরো-

হে ভাষা স্বাধীনতার ধারক ও বাহক যারা।

এ আমার অঙ্গিকার-রবিউল হাসনাত সজল

অনেক শীত বসন্ত পেরিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করেছি আজ 

যেখানে আমার আমিটা

একান্তই আমার,

যেখানে আমার চারপাশের আমি গুলোর কাছে

কেবলি তাদের প্রয়োজনেই আমিটা আমি হয়ে উঠি

অথচ, অন্ধকার মাখা

রাত-দিনের বিশ্লেষণে

আমার আমি তে কেবলি

আমিই থেকে গ্যাছি বার বার

অথচ কি চমৎকার ভাবে

আমাকে সবাই ব্যবহার করছে-

ঘরের আসবাব পত্র-

খাট,বালিশ, বিছানার মতো,

বাটি-ঘটি,গ্লাস-প্লেটের মতো,

কখনো কাগজ-কলম, বই-খাতার মতো,

কখনো খাবার দাবার

ঔষধ পত্রের মতো নিয়ম করে

 যখন যার যেভাবে প্রয়োজন হয়েছে- সেভাবেই,

হায়রে জীবন!

এটা কে কোন জীবন বলে কিনা জানি না,

হয়ত এটাও জীবনের-

কোন না কোন নিয়মের সাথে মিলে যাবে এক দিন, না এক দিন

নইলে এমন হবে কেনো?

হয়তো এভাবে আমার আমিকে

আমার চারপাশের একান্ত

আমি গুলোর প্রয়োজনে ব্যবহার হওয়াটায় আমার জন্য

আমি কোন নিয়ম না হয়

ভুল সময়ে জন্মানোর খেসারত,

না হলে এমন হবে কেনো??

অন্তত এই গুড়ি গুড়ি বর্ষামাখা শীতে তো তাই মনে হচ্ছে,

তাই আজ থেকে-

এই মুহূর্ত থেকে

আমার আমিকে

আমার মতো করে বাঁচতে

শিখিয়ে নিলাম,

আমার মতো করেই হাসতে

কাঁদতে শিখিয়ে নিলাম,

আজ থেকে আর কোন

আমার একান্ত আমি গুলোকে

আর মুখোমুখি দাঁড় করাতে

চাই না কোন

আদিমতার আড়ম্বনতায়,

এখন দুচোখ আমার

মাছ রাঙা মনেই

দেখবে পৃথিবী-

দেখবে অষ্টদশী থেকে

ত্রিশ উত্তর সব সূর্যমুখি আর

প্রিয় কবি কাজী নূরের

নতুন একটা বন্ধুর মতো

সেই অচেনা বন্ধুকে

অনায়াসে চিনে নেবো প্রতিদিন,

উড়তে থাকবো মেঘের মতো

আকাশ থেকে আকাশে

যে আকাশে রঙের মেলা বসে,

মেলার সে রঙে

নিজেকে রঙিন করতে করতে

আমার আমিকে হারিয়ে ফেলবো-কৃষক-মুজুর,

কুলি আর জেলে ও কুমোরে মুখের হাসিতে,

মাঠের পরে মাঠ

দু’পায়ে মাড়িয়ে নেবো

রাখালের সেই খালি পায়ে,

শুধু আমার সেই একান্ত আমি গুলোর কাছে

আর কখনো

আমার আমিকে রক্তাক্ত হতে দেবো না,

ব্যবহৃত হতে দেবো না

তাদের মতো করে শুধু তাদের

প্রয়োজনের মাপ কাঠি হতে,

বিস্তীর্ণ জীবনের দিনান্তে

এ আমার অঙ্গিকার।

অভিমুখীন-সুমন বিশ্বাস

এক পা দু’ পা করে এগিয়ে যাচ্ছি

হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলাম থমকে,

আর এগোনো যাচ্ছে না,

হয়তো আর এগোনো যাবে না;

সবকিছু আমার প্রতিকূলে,

এ যুদ্ধে আমি একা।

আদর্শ পাঠশালায় এতোদিন

যা কিছু অন্যায় আর অনিয়ম বলে

জেনেছি  তাই আজ নিয়ম।

এ অনৈতিক নিয়মের মাঝে

আমি অসহায়।

ধ্রুবতারা কিংবা শুকতারা মেঘে ঢাকা।

কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম, ভাবলাম –

এখানে এভাবে থেমে যাওয়া মানে

শুধু পরাজয় নয়- মৃত্যুরও অপমান।

মাথার ভিতর আচমকা একটা ঝড়ে

বসন্তের বাতাস যেন লাগল গায়ে

অন্তর সত্ত্বায় নতুন করে

শক্তি সঞ্চারিত হলো

আমি দৃঢ়চেতা হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম

আগে তো এক পা বাড়াই

তারপর না হয় দ্বিতীয় পাটাও……….

ভালোবাসা ওয়েসিস-রিয়া বণিক

এই নিত্যদিনের মৃত্যু মিছিল, ভালোবাসা বিহীন মরুভূমিতে

তোমার আমার সম্পর্ক এক টুকরো মরুদ্যানের জন্ম দিয়েছে।

সকাল থেকে সন্ধ্যে এক উদ্ধত হিংসার বাতাবরণে জীবন অতিষ্ঠ।

এরই সাথে জোট পাকিয়েছে মহামারী।

কখন যে কার কোন বক্তব্যে দাঁড়ি পড়বে,

জানা নেই কারোর।

ত্রস্ত আতঙ্কিত মানুষের দোরে জীবন-মরণ এক

চাতালেই নাচছে।

যে কদিন বাঁচি, ভালোবেসে যাই,

ভালো থেকে যাই, ভালো রেখে যাই।

তোমার আমার সম্পর্ক এই ভালোবাসা

বিহীন মরুভূমিতে মরুদ্যানের জন্ম দিয়েছে।

যতদিন বাঁচবো এই মরুদ্যানকেই সত্যি প্রমাণ করে যাবো।

তুমি আমায় ভালোবাসা দিও, আমি তা জনমানসে বিলিয়ে দেবো…!!

বৈপরীত্য-অরুণ বর্মন

বছর ঘুরে এলো আবার রোজা দ্বীনের ঘরে

সিয়াম সাওম নিরাসক্তি ত্যাগের দীক্ষা তরে।

রাখতে রোজা মুমিনগণে হুকুম দিলেন তিনি

ইবাদত আর বন্দেগী সব করতে রাত্রি দিনই।

মুমিনগণে বসে কোণে আল্লাহ্ মালিক খোঁজা।

দ্বীনভাবেতে দীনের দয়া করতে পালন রোজা।

সেভাব কোথায় যাচ্ছে উবে আধুনিকের ছোঁয়ে

রোজা আসতেই ব্যস্ত আগাম ঈদের ফুর্তির মোহে।

রোজার চেয়ে ঈদের তরে হচ্ছে হারাম ঘুমে

বাজারঘাটে ঠাসাঠাসি কেনাকাটার ধুমে।

ব্যবসায়িরাও হালাল ভুলে হারাম পথে কামায়

যে যার মতো নিচ্ছে লুটে কে কার হারাম থামায়।

খোদা এখন ঘর ছেড়ে ঐ বাজারময়ে ঘোরে

সংযমীভাব যাচ্ছে দূরে বাজার করার জোরে।

নামাজ রোজার আত্মিক দর্শণ ভুলছে মুমিনগণে

হাজার নেকি নষ্ট করে ছুটছে মোহের সনে।

শঙ্খ-রনি নাগ মুন্না

 দোকানে আসিফ ভাই আসলো মোবাইলে কথা বলতে বলতে কিছুক্ষন কথা বলার পর ! পরে কথা বলব বলে কেটে দিল মোবাইল। আসিফ ভাই জিজ্ঞেস করল আমাকে।

-কেমন চলছে দিন কাল ভাই?

আমি    -ভালো। কার সাথে কথা বললেন?

আসিফ -বান্ধবীর সাথে।

আমি    -ভালোই সময় যাচ্ছে আপনার।

আসিফ -আপনার ভালো কাটছে না?

আমি    -না ভাই, ভালো লাগে না।

আসিফ -লাবণ্য নামে ওর একটা মিষ্টি বান্ধবী আছে, সুন্দর কথা বলে।ওর সাথে কথা বলেন।ভালো লাগবে।

আমি  -না ,লাগবে না।

আসিফ-দাঁড়ান বান্ধবীকে ফোন করে লাবণ্যর নাম্বার নিয়ে দিচ্ছি।

মোবাইল নাম্বারটি নিয়ে একটা ছোট কাগজে লিখে আমার টেবিলে রেখে চলে গেল। আর বলল এ নাম্বারে ফোন করে কথা বলেন। আমি কাগজটা টেবিলের ডেক্সে রেখে দিলাম। কিছুদিন পর আবার আসলো আসিফ কথা হয়েছে লাবণ্যর সাথে ? আমি বললাম না। কথা বলে দেখেন। ভালো লাগলে কথা বলবেন। এটা বলে এই বিষয়ে আর কথা হয়নি। আমরা দু,জন বাহিরে গিয়ে কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে চা,হালকা নাস্তা করে চলে গেল আসিফ আমি দোকানে চলে আসলাম।এর কয়েক দিন পরে বিকালে একা দোকানে বসে আছি।চিন্তা করলাম টেবিলের ডেক্সটা পরিস্কার করে ফেলি। তখন হাতে পরল লাবণ্যর মোবাইল নাম্বার লেখা কাগজটি।কাগজ থেকে মোবাইলে নাম্বারটি উঠিয়ে ফোন দিলাম লাবণ্যকে। কয়েকবার রিং পরল কেউ রিসিভ করল না। আবার কিছুদিন পর বিকালে ফোন দিলাম লাবণ্যর নাম্বারে। রিং দু,বার পরার পর রিসিভ করল লাবণ্য। আমার পরিচয় জানার পর কাজ আছে বলে কেটে দিল ।পরদিন বিকালে আবার তার কাছে ফোন করলাম। একটু কথা বলার পর তার মা আসল কেটে দিল ফোন। তার সাথে কথা বলার আগ্রহ যেন বেড়েই গেল। পরদিন সকালে ফোন করলাম কথা বলে তার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। জানতে পারলাম-  তারা এক ভাই এক বোন। সে বড় ,দ্বাদশ শ্রেনিতে পড়ে, ভাই পঞ্চম শ্রেনিতে। বাবা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হিসাবে কর্মরত আছে।মা গৃহিনী। প্রায় দিন সময় পেলে তার সাথে কথা বলতাম। ফোনে আমাদের আড্ডা বেশ জমে উঠল।এক সময় সে আমার সাথে একদিন কথা না বললে ঘুম হত না।পাগলের মত হয়ে যেত।লাবণ্য তার মোবাইল নরমাল হওয়ার কারনে একে অন্যর ছবি দেখার সুযোগ হয়নি।তবুও যেন ভালোবাসার কমতি ছিল না।প্রত্যেক দিন সকালে ওর ফোন পেয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গে । তার জন্মদিনে ওর বাবা জামা কিনার জন্য পনের শত টাকা দিয়েছে।ঐখান থেকে একশত টাকা আমার মোবাইল নাম্বার এ রিচার্জ করে দিয়ে ছিল।এভাবে ভালোবাসা দিন দিন বেড়ে চলেছে।একদিন সন্ধ্যায় লাবণ্য ফোন করল আমাকে কথা বলতে বলতে হঠাৎ ওকে দুষ্টামি করে বললাম তুমি হিন্দু ?ও চুপ হয়ে গেল।কিছুক্ষন পর বলল সন্দেহ হয়?শুন আমার মা শঙ্খ বাজাচ্ছে।এর পর বিশ্বাস করানোর জন্য প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায় তার মায়ের শঙ্খ বাজানো শোনাত।

দ্বিতীয় মৃত্যু প্রথম যৌবনে–আহমদ রাজু

শিখা আবারও আজ আত্মহত্যা করবে তা বাড়ির সবাই বুঝতে পেরেছিল হয়তো। সবাই বলতে তার বাবা-মা আর বড় ভাই সোহেল। কেউ বাঁচাবার প্রয়োজন বোধ করেনি সেসময়। তার অবশ্য কারণও ছিল। কারণ যতই থাকুক, যদি তাকে চরম সত্যর পথ থেকে ফেরাতো তাহলে আজ বাড়ির সবাইকে এমন নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো না। অন্তত আর দশটা পরিবারের মতো বসবাস করতে পারতো এই সমাজে।

সবেমাত্র ক্লাস নাইনে উঠেছে শিখা। নমিতার বড় ভাই পরেশের সাথে সেই ক্লাস সেভেন থেকে মন দেওয়া নেওয়া চলছিল তার। মাস তিনেক আগে কথাটা জেনে খালেকুজ্জামান অফিস থেকে রাতে বাড়িতে এসে মেয়েকে শাসায়। পরেশের সাথে মিশতে নিষেধ করে। বাবার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছিল শিখার। এর আগে কোনদিন বাবার মুখোমুখি হয়নি সে। খালেকুজ্জামান মেয়ের এমন অবনতি দেখে গালে চড় বসিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘যদি আর ওদিকে পা বাড়িয়েছিস তাহলে কপালে দুঃখ আছে।’ কী দুঃখ আছে তা স্পষ্ট করে না বললেও শিখা বুঝে ফেলেছিল কী আছে শেষে। চৌদ্দ বছরের জীবনের ওই প্রথম বাবা তার গায়ে হাত তুলেছিল। বাবার ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা হয় শিখার। সামান্য ব্যাপার নিয়ে গায়ে হাত তুললো! মনে মনে ভাবে এ পৃথিবীতে তার আর বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। সে সবার অজান্তে ঘরে থাকা নয়টি ঘুমের ট্যাবলেট গিলে খেয়েছিল। সবাই ভেবেছিল মারাই গেছে। মন বোঝানোর জন্যে হাসপাতালে নেওয়া হলে অলৌকিকভাবে সেরে ওঠে সে যাত্রায়। কিছুদিন পর বাবার কথা উপেক্ষা করে সে পরেশের সাথে দেখা করে- ঘুরে বেড়ায়। এক কান দু’কান থেকে শুরু করে পাঁচ কান পর্যন্ত পৌঁছে যায় সে কথা। 

সড়ক ও জনপথ বিভাগে চাকুরীর সুবাদে নয়নগঞ্জ ষ্টেশন বাজারের পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে থাকে খালেকুজ্জামান। বাড়ি তিন কিলোমিটার দূর হলেও সেখানে থাকার প্রয়োজন বোধ করেনি কোনদিন। কর্মস্থলের পাশে যখন থাকার বন্দোবস্ত তখন গ্রামের বাড়ি থেকে কষ্ট করে আসার-যাওয়ার কোন মানেই হয় না তা ভাল করে জানে। তাছাড়া ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার জন্যে এখানকার চেয়ে ভাল জায়গা আর নেই। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, হঠাৎ মেয়েটার কারণে তিলে তিলে অর্জন করা মান সম্মান এক নিমেষে ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। পাড়ার মানুষের মুখে মুখে তার মেয়ের কথা। সন্ধ্যায় ষ্টেনের পাশ দিয়ে বাড়িতে যাবার সময় সিংহগাতি গ্রামের কাশেম মাতব্বর খালেকুজ্জামানকে থামিয়ে পান চিবোতে চিবোতে বলে, ‘সমাজে আমরা ছেলে মেয়ে নিয়ে বসবাস করি। একটা পরিবারের জন্যে সমাজ দূষিত করতে দেবো না।’ খালেকুজ্জামান বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, ‘আমি ঠিক বুঝলাম না ভাই?’

‘না বোঝার কিছু নেই। তোমাকে আগেওতো সাবধান করা হয়েছে।’

‘কী হয়েছে ভাই যদি খুলে বলতেন?’ বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করে খালেকুজ্জামান।

‘তোমার মেয়ে যে এলাকায় এক হিন্দু ছেলের সাথে লীলা কীত্তন করে বেড়াচ্ছে সে খবর রাখো?’

‘কেন, শিখাতো আর ওই বদমায়েশ ছেলেটার সাথে মিশছে না। আমি তাকে খুব করে শাসিয়েছি। অভিমানে মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আপনিতো সবই জানেন।’

কাশেম মাতব্বর বাম দিকে ঝুকে ফিক করে পানের পিক ফেলে বলে, ‘জানলে কি হবে; তারাতো দিব্বি আবারো মজা করে বেড়াচ্ছে। তুমরা বাপু এখান থেকে বিদায় হও। আমাদের ভদ্রভাবে বসবাস করতে দাও।’

খালেকুজ্জামান লোকটার কথায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না। সে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

কিছুক্ষণ আগে দিনের ক্লান্ত সূর্যটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। অন্ধকারের চাঁদরে মুড়তে শুরু করেছে সমস্ত পৃথিবী। শিখা বারান্দার দক্ষিণ কোনায় মাটিতে মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসেছে। বাবাকে ঘরে ঢুকতে দেখে তার মনে খটকা লাগে। বাবার মুখে বিষাদের ছায়া তার চোখ এড়ায় না। খালেকুজ্জামান ঘরে ঢুকে মেয়েকে ডাক দেয়। বাবার ডাক শুনে শিখা ভয়ে ভয়ে ঘরের ভেতরে যায়। ঘরে তার মা আগেই বসা ছিল। বাবার গলা শুনে সোহেলও এগিয়ে যায়।

‘আমাদের একটু শান্তিতে থাকতে দিবি নাকি?’ কোন বিশেষণ না দিয়ে শিখার উদ্দেশ্যে কথাটি বলল খালেকুজ্জামান।

শিখা কোন কথা বলে না। সে যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।

সোহেল বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আবার কী হলো বাবা?’

‘কী হয়নি তাই বল? এলাকায়তো মুখ দেখাবার জো নেই? আসার পথে মাতব্বর শাসালো আমরা যেন এলাকা ছেড়ে চলে যাই।’

জরিনা বানু স্বামীর উদ্দেশ্যে বলল, ‘আগে কি হয়েছে বলবে তো?’

‘তোমার মেয়েটাকে শত নিষেধ করা সত্ত্বেও সেই হিন্দু ছেলেটার সাথে মেলামেশা করে। যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়।’ কথাটি বলে কেঁদে ওঠে খালেকুজ্জামান। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘কী পাপ আমি করেছিলাম, এই বয়সে এসে লোকে আমার দিকে থুথু ফেলে।’

শিখা পাথরের মূর্তির মতো নিচের দিকে চোখ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না। জরিনা বানু খাটের ওপর বসা ছিল। সে স্বামীর চোখে জল দেখে নিজেকে সামলাতে পারে না। উঠে এসে মেয়ের গালে কয়েকটা চড় বসিয়ে দেয়। বলল, ‘মরতে পারিস না। নাকি তোর মরণও নেই? যদি জানতাম তুই আমাদের মান সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলবি তাহলে জন্মের পরেই লবন গালে দিয়ে মেরে ফেলতাম।’ কেঁদে ওঠে সে।

শাড়ীর আচঁল দিয়ে চোখ মোছে জরিনা বানু। সে স্বামীকে শান্ত্বনা দেয়। বলল, ‘ওমন মেয়ে আমাদের দরকার নেই। তুমি বাড়ি থেকে বের করে দাও। ভাববো আমাদের কোন মেয়ে নেই-ছিল না।’

সোহেল কোন কথা বলে না। সে বুঝতে পারে না কী করবে। তার ছোট বোন এমন করবে তা কখনও কল্পনাও করেনি। প্রথমবার যেদিন কথাটা জেনেছিল সেদিন ভেবেছিল ছোট মানুষ, ভুল করতেই পারে। আস্তে আস্তে শুধরে যাবে। কিন্তু আজ রাস্তায় বাবাকে অপমানিত হতে হয়েছে জেনে সে শিখাকে বলল, ‘এখনও সময় আছে নিজেকে শুধরে নে। তুই আমাদের সম্মান নিয়ে এভাবে খেলা করিস না।’

সোহেলের কথায় উত্তেজিত হয়ে ওঠে খালেকুজ্জামান। বলল, ‘কিসের শুধরানো? এ বাড়ি থেকে এখনি বিদায় কর ওকে। হয় ও বাড়ি থাকবে না হয় আমি। যদি ও এই বাড়িতে থাকে তাহলে আমিই নিজেকে শেষ করে ফেলবো।’

শিখার দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। সে এক দৌঁড়ে নিজের রুমের ভেতর যেয়ে দরজার সিটকিনি আটকে দেয়।

বাবা-মা একটু শান্ত হলে সোহেল শিখার রুমের কাছে যেয়ে দেখে দরজা বন্ধ। সে শিখাকে ডাক দেয়। একবার-দুইবার-অনেকবার, দরজা ধাক্কায়। না কোন উত্তর আসে না। তার মনে ভয়ের সঞ্চার হয়- কোন কিছু হলো নাতো? সে ঘরের পেছনে যেয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে মেঝেতে শিখা পড়ে আছে। অজানা আশঙ্কায় ভয়ে চিৎকার করে ওঠে সে। তার চিৎকারে সবাই ছুটে এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখে মেঝেতে শিখার নিথর দেহ। পাশে ক’দিন আগে বাড়ির আঙিনায় লাগানো সীম গাছে দেবার জন্যে আনা কীটনাশকের খালি শিশি। একটা চিরকুট পাওয়া যায় পাশে। তাতে শুধুমাত্র লেখা, ‘পরজনমে আমাদের মিলন হবে। ইতি- তোমার বউ।’ পুলিশ আসে; লাশ নিয়ে যায় পোস্টমর্টেম করতে।

শহর থেকে মাটিতোড়া গ্রামে যখন লাশ এসে পৌঁছায় তখন বিকাল তিনটা। গ্রামে লাশ আনা হচ্ছে জেনে আগেই মসজিদের ঈমাম মাওলানা জুলমত খা ফতোয়া দিয়েছে, ‘কোনভাবেই ঐ মুরতাদের লাশ এই গ্রামের গোরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না। আত্মহত্যা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করেছে সেও জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ঐভাবে নিজ হাতে বিষপান করতে থাকবে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমরা নিজেরা নিজেকে হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়ালু। তারপরও যে আত্মহত্যা করল সে সীমা লঙ্ঘন ও জুলুম করল, অচিরেই আমি তাকে জাহান্নামের আগুনে পৌঁছে দেবো।’’ মাওলানা জুলমত খা হাতে থাকা পানটা মুখে পুরে দিয়ে আবারো বলে ওঠে, ‘যে কারণে কোনভাবেই ঐ কাফেরের লাশ এ গ্রামে দাফন করতে দেওয়া উচিৎ নয়।’ তার কথায় সম্মতি দেয় মাতব্বর আলহাজ্ব খালেক ধাবক। গ্রামের মেম্বরও সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।

নয়নগঞ্জ ষ্টেশন বাজারের পাশে সিংহগাতী কবরস্থানে দাফন করার কথা খালেকুজ্জামানের মাথায় একবারও আসেনি। নিজ গ্রামে কবরস্থান থাকতে অন্য জায়গার কথা ভাববেই বা কেন? কিন্তু নিজের এলাকার যে অবস্থা তাতে সেখানে কবর দেবার কথা নতুন করে ভাবতে হচ্ছে তাকে। শিখার বড় ভাই সোহেল মসজিদের ঈমাম থেকে শুরু করে গ্রামের মাথাধরা সবার কাছে যেয়ে হাত জোড় করেছে- পায়ে পর্যন্ত ধরেছে। কাজ হয়নি। তারা কোনভাবেই গ্রামের মাটিকে অপবিত্র করতে দেবে না!

মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় খালেকুজ্জামান চোখে অন্ধকার দেখে। সামনের সময়টা কিভাবে পার হবে তা সে বুঝতে পারে না। চিন্তা করার সমস্ত শক্তি ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছে। জরিনা বানু মেয়ের অভিমানী মুখ দেখে সেই যে জ্ঞান হারিয়েছে এখনও জ্ঞান ফেরেনি বলা চলে। দু’তিন ঘন্টা পরপর যা একটু চোখ মেলছে পরক্ষণে আবারো জ্ঞান হারাচ্ছে। একমাত্র বোনকে হারানো ভাই সোহেলও ভেঙে পড়েছে রাই শরিষার মতো। বোনটার ন্যায্য অধিকার সাড়ে তিন হাত মাটির বন্দোবস্ত করার জন্যে সে সারাদিন কম চেষ্টা করেনি।

 শোকার্ত পরিবারের পাশে কেউ এসে দাঁড়ায় না। এলাকার কেউ না-বাইরের কেউ না। যেন বড় কোন অপরাধ করে ফেলেছে। বাড়িতে ভীড় করা যে লোকগুলো আছে তারা শুধুমাত্র দেখতে এসেছে এর পরে কী হয় এ জাতীয় কিছু। কিংবা তারা সর্বোচ্চ একটু হা-হুতাশ করতে পারে, চোখের জল ফেলতে পারে। তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না গ্রামের কবরস্থানে কবর দিয়ে শিখার অতৃপ্ত আত্মাটাকে তৃপ্ত করার। সমাজের বাইরে যাবার ক্ষমতা তাদের কারো নেই। যারাই এ সমাজের বিরুদ্ধে কথা বলবে তাদের শিখার পরিবারের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে যেকোন ভাবে।

উপায় না পেয়ে খালেকুজ্জামান গভীর রাতে মেয়ের লাশ নিয়ে নয়নগঞ্জ ষ্টেশন বাজারের সরকারী কোয়াটারে ফিরে আসে। লাশ নিয়ে আসার কথা জানতে পেরে এলাকার লোকজন আগেই কোয়াটারের সামনে এসে ভীড় করে। মাতব্বররা সিংহগাতী কবরস্থানে কোনভাবেই অপমৃতের লাশ দাফন করতে দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। ভ্যানগাড়ি থেকে শিখার লাশ বারান্দায় রেখে বাবা ছেলে মিলে তাদের হাতে পায়ে ধরে। কোন কিছুতে মন গলে না। মুন্সি গিয়াস উদ্দিন আঙ্গুল উঁচিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে, ‘আমাদের এ গ্রাম অত্যন্ত পবিত্র। এখানে কোন শয়তানের স্থান নেই। আত্মহত্যা করা ইসলামী শরী’আতে একটি জঘন্যতম পাপ যার একমাত্র শাস্তি হল জাহান্নাম। বিশ্ব নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আত্মহত্যাকারীর জানাযা ছালাত আদায় করেননি। এ থেকে অনুমান করা যায় সে কত বড় পাপী। আত্মহত্যা ইহকাল পরকাল উভয়-ই ধ্বংস করে দেয়।’ মুন্সি গিয়াস উদ্দিনের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ কথা বলে না।

ইতিমধ্যে একদিন দুই রাত পার হয়েছে। এখানকার অবস্থা মাটিতোড়ার মতো দেখে হতাশায় মাথা ঘুরে ওঠে খালেকুজ্জামানের। সে মাটিতে বসে পড়ে। সোহেল বাবাকে ধরে বারান্দায় শুইয়ে দেয়। সে নিশ্চিত এখানকার লোকজন তার বোনকে দাফন করতে দেবে না। সে পাশের নেওয়ারগাছা গ্রামে কমিশনারের কাছে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। সোহেল শুনেছে এই কমিশনারের কারণে নাকি এলাকার আইন-শৃংঙ্খলার চরম অবনতি হচ্ছে। সে এলাকার ত্রাস। পর পর তিনবার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছে ক্ষমতার জোরে। সে নাকি মাদক ব্যবসায়ী- চোরাকারবারী, খুনী, বোমাবাজ আরো কত কী। তার মন বলে, যতই খারাপ হোক, সেতো মানুষ। হয়তো কোন একটা ব্যবস্থা সে করবেই। তাছাড়া যত দেরি হচ্ছে ততই লাশের অবস্থা বেগতিক হচ্ছে; গন্ধ ছুটতে শুরু করেছে। বাজার থেকে বরফ এনে দেওয়া হলেও তাতে খুব বেশি কাজ হয় না। সে ভোরে অন্ধকার থাকতে থাকতে রওনা দেয় নেওয়ারগাছা গ্রামের উদ্দেশ্যে।

সোহেল নেওয়ারগাছার কমিশনার গালকাটা রবিনের বাড়ি যখন উপস্থিত হয় তখন সকাল সাতটা। কমিশনারের কাছে সোহেল ভয়ে ভয়ে সব কথা খুলে বলে। সব কথা শোনার পর বলল, ‘কেউ যখন তাদের এলাকায় কবর দিতে দিচ্ছে না তখন আমার এলাকায় তোমার বোনের কবর দেবার ব্যবস্থা হবে। একটা মৃত মনুষের সাড়ে তিনহাত মাটি পাওয়া তার নাগরিক অধিকার। সে অধিকার আমরা খর্ব করতে পারি না। তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে সব ব্যবস্থা করো।’ কমিশনারের কথা শুনে তার সম্পর্কে সমস্ত ধারণা তার পাল্টে যায় সোহেলের। সে মনে মনে কামনা করে এমন কমিশনাররা-ই যেন ক্ষমতায় থাকে যুগ যুগ।

কবর দেওয়ার বন্দোবস্ত হওয়ায় সবাই যখন নেওয়ার গাছার উদ্দেশ্যে রওনা হয় তখন হঠাৎ এক পশলা অনাকাঙ্খিত বৃষ্টি এসে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা শিখার লাশটাকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।

তুমিই তো আমার পৃথিবী -বেলাল মাসুদ হায়দার

পার্কের বেন্চে নিবিড় হয়ে

পাশা পাশি বসে।

এক জোঁড়া বৃদ্ধ বৃদ্ধা ।

আবেগ জড়িত কন্ঠে বৃদ্ধা

বললো —- তোমাকে ভালবাসি।

শুনে বৃদ্ধ বলে—- আমিও বাসি।

প্রমান দিয়ে পৃথিবীকে চমকে

দাও দেখি ——- বৃদ্ধা বলে।

কানের কাছে মুখ নিয়ে,  ফিসফিস  করে

বৃদ্ধ ভাব আবেগে বলে—-

তোমাকেই তো ভালবাসি।

চমকে যেয়ে বৃদ্ধের হাত ধরে অবাক

হয়ে বৃদ্ধা বলে– চুপি চুপি বললে,

পৃথিবী জানবে কি ভাবে?

বৃদ্ধাকে বুকে জড়িয়ে মুগ্ধ চোঁখে

বললো বৃদ্ধ — তুমিই তো আমার পৃথিবী।

তুমি জানলেই হবে।

মাহে রমাদান-এম এ কাসেম অমিয়

এগারটি মাস পার করে আজ দুয়ারে রমাদান

সব ছেড়ে আল্লার রাহে করতে সিয়াম সাধন।

তাঁর ভয়ে করবো না পান এক ফোঁটাও জল!

দিবেন তিনি নিজ হাতে মোদের কষ্টের ফল।

রমজানের শিক্ষা নিতে হবে দীক্ষা অন্যায়-অবিচার করবো দুর;

ঝগড়া বিবাদ করবো নাকো গাইবো মানবতার সুর।

পরনিন্দা পরচর্চা হতে দুরে রইবো করবো না গীবত!

হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে যাবো মোরা অহংকার করবো রহিত।

ষড় রিপুর তাড়োনা থেকে করতে হবে সংযম সাধন,

লোভ-লালসা পরিহার করে করতে হবে চরিত্র গঠন।

তাকোয়ার আগুনে পুড়ে পুড়ে মোরা হয়ে যাবো খাঁটি মানুষ;

ক্ষণিকের দুনিয়ায় সবই মিছে সবই যেন ফানুস!

সমাজে যত ভুখা-নাঙ্গা আছে, আছে যত গরীব-দুঃখী;

যাকাত-ফেতরা,মানত-ছদকা করবো দান করবো সুখী।

ধনী-গরীব ভেদাভেদ ভুলে চলবো সবে সমানে সমান।

ইসলামের শিক্ষা বিলাবো মোরা গাইবো সাম্যের গান।

রমাদান শেষে ঈদের মাঠে এক সাথে সবে জুটি!

হাসি আর খুশি বিলাবো মোরা দু’হাতে মুঠি মুঠি।।

চাঁদের হাসি-শহিদুজ্জামান মিলন

আকাশ জুড়ে ফুটলো যখন,

মিষ্টি চাঁদের হাসি।

উঠলো জেগে কুসুম কলি,

বাজলো ইদের বাঁশি।

খুশির বার্তা নেমে এলো,

চাঁদের সাথে সাথে।

মানুষ তখন ভেদাভেদ ভুলে,

আনন্দতে মাতে।

খুশির পাখি উঠলো গেয়ে,

প্রাণ জুড়ানো গান।

গাছে গাছে ছড়িয়ে গেল,

সুরের ঐক্যতান।