Home » 2022 » May (page 3)

Monthly Archives: May 2022

সকালের মেঘ-জাহিরুল মিলন

সকাল ভর্তি পরিক্ষা দিতে ঢাকায় যাবে। এবার সে এইচ এস সি পরীক্ষায় পাশ করেছে। তিন বিষয়ে লেটারসহ স্টার মার্কস নিয়ে কৃতিত্বের সাথে সে পাশ করেছে। উজ্জ্বল করেছে বিদ্যালয় ও পরিবারের মুখ। তাড়াতাড়ি গোজগাজ করে বেরিয়ে পড়তে হবে তা না হলে দেরি হয়ে যাবে। বাস আসবে বিকালে ৫ টাই তাই সব গুছিয়ে রাখতে হবে এখনি। একটা ছোট বাক্সে তার সকল প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র গচ্ছিত ছিল। বাক্স খুলে সব কাগজ-পত্র বের করে দেখছে কোনটা লাগবে আর কোনটা লাগবেনা। কাগজে কাগজে সমস্ত ঘর একাকার করে ফেললো। হঠাৎ তার চোখ একটি বইয়ের উপর গিয়ে থমকে গেল। বইটি প্রখ্যাত উপন্যাসিক জাহিরুল মিলনের লেখা “পৃথিবীর আলো”। বইটির মলাটে ধূলা লেগে কিছুটা মলিন দেখালেও কি যেন এক অজানা ভালোলাগা মিশে আছে তার উপর। সকাল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মোচড় দিয়ে উঠল বুকের বাম পাশ। আকষ্মিক দু’গন্ড বেয়ে কয়েক ফোঁটা মুক্তার দানার মত অশ্রু বইটির উপর পড়ল। ডুকরে কেঁদে উঠল অবুঝ মন। পাশেই সেই রক্ত আর অশ্রু মাখা টি-শার্ট। নিজেকে আর সামলাতে পারলোনা টি-শার্টটি নিয়ে রক্তে ভেজা স্থানটা বারবার দেখতে দেখতে চুমু খেতে আর কাঁদতে লাগল। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে বইটি স্বস্নেহে নিজের হাতে তুলে নিয়ে শার্টের এক কোনা দিয়ে আলতো করে মুছে একটা চুমু খেয়ে জড়িয়ে নিল বুকে। হৃদয় ভেঙ্গে যেতে লাগল চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোখ মুছে বইটি মেলে চোখের সামনে। ভেসে উঠল সেই পুরাতন স্মৃতি।

সালটা ছিল ২০০০। আগষ্টের মাঝামাঝি। সকাল এসএসসি পাশ করে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাড়ি শহর থেকে অনেক দূরে তাই হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতে হয়। কলেজের প্রথমদিনে চোখে পড়ে এক অপরুপ সুন্দরী। দেখতে পরমা সুন্দরী গল্পে যাকে বলে পরীর মত। সকাল এমনিতে একটু লাজুক প্রকৃতির সহজে কোন মেয়ের সাথে কথা বলেনা। কিন্তু মেয়েটিকে দেখার পর তার খুব ভাল লাগল। কথা বলতে ইচ্ছে করল কিন্তু সাহসে পারল না। কিছুদিনের মধ্যে তার কয়েকজন বন্ধু হয়ে গেল। একসাথে চলতে চলতে সবার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেল সে।

একদিন ক্লাস করে বন্ধুদের সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসে বসার জন্য সকলে একটা জায়গা খুঁজছিল। হঠাৎ একটা নারী কণ্ঠ শুনতে পেল সকাল।

“এই মুর্তজা কোথায় যাচ্ছিস? এখানে আয়”।

সকাল তাকিয়ে দেখে সেই মেয়েটি।

সে জিজ্ঞাসা করে –“কে রে ও? তুই ওকে চিনিস?”

মুর্তজা বলে- “ও! ওর সাথে তোর পরিচয় হয়নি? ও আমাদের বন্ধু মেঘ। আমরা একই বিদ্যালয়ে পড়েছি। খুবই ভালো মেয়ে”।

-আসছি।

কথা বলতে বলতে মুর্তজা উত্তর দিল। তারপর সকালকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যায় সেদিকে। সকাল যেতে চাচ্ছিলনা। মুর্তজা একরকম জোর করে তাকে সেখানে ধরে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে মুর্তজা তাকে তাদের আসরে বসিয়ে দিয়ে পাশে বসে পরিচয় করিয়ে দিল।

“আমাদের বন্ধু সকাল”।

“সকাল! খুব সুন্দর নামতো!”

মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল। সকাল লজ্জায় তখনো মাথা তোলেনি। যেন সে মস্তবড় অপরাধ করেছে। মেয়েটি তাকে জিজ্ঞাসা করল-

“তুমি মাথা নিচু করে আছো কেন?”

সকাল কোন কথা বলেনা।

“আমি মেঘ, জাহিরা মেহজাবিন মেঘ”। বলে মেয়েটি সকালের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। সকাল কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা।

“এই সকাল কি করছিস ? লজ্জা পাচ্ছিস কেন? এরা সবাই আমার বন্ধু”।মুর্তজা কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলল।

সকাল এবার তার কাঁপাকাঁপা হাতটি মেঘের দিকে বাড়িয়ে তার হাতের সাথে মিলায়ে বলল

“আমি সকাল, জাহিন শাহরিয়ার সকাল”।

এবার সকাল মেঘের দিকে ভাল করে তাকালো। সেদিন দূর থেকে দেখেছিল। ভাল করে দেখা হয়নি। আসলেই সে পরমা সুন্দরী। টানা টানা চোখ, গোলাপের পাপড়ির মত দু’ঠোট, ভ্রমর কালো একগুচ্ছ চুল নেমে গেছে নিতম্ব পর্যন্ত। সে এক অনন্যা সুন্দরী যাকে প্রথম দর্শনে যে কেউ ভালবেসে ফেলবে।

“আমাদের দেখে লজ্জা পাবার কিছু নেই আমরা তোমার বন্ধু”।

হঠাৎ সে মেঘের কথায় সম্বিৎ ফিরে পেল। শুধু মাথা নেড়ে সে সম্মতি জানালো। তাদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হল তারপর যে যার বাড়ির দিকে রওনা দিল।

দিনের পর দিন পার হয়ে যায়। সকাল ও মেঘের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ট হতে লাগলো। তারা বন্ধুর মত তুমি থেকে তুইতে পৌছাল। সকাল ও মেঘ যেন একদিন দুজন দুজনকে না দেখে থাকতেই পারেনা। তাই প্রতিদিন তাদের কলেজে আসতেই হবে। সকাল অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। সে এখন কথা না বলে থাকতেই পারেনা। সেই এখন সকলের চেয়ে বেশি কথা বলে। বন্ধুদের আসরটা সেই নানান গল্পে মজিয়ে রাখে। মনে মনে সে মেঘ কে অনেক ভালোবাসে। মেঘও যে সকাল কে ভালোবাসেনা তা নয়। তার ও মনের কোনে সকালের জন্য একটা অধিকারের স্থান দিয়ে রেখেছে।

সকাল ও মেঘ দুজন দুজনার অনেক কাছাকাছি এলেও কেউই তাদের মনের ভাল লাগার কথা প্রকাশ করতে পারেনি। আসলে সাহসই হয়নি ওদের। ওদের দুজনারই ভাবনা যদি দুজনার মধ্যে এই নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়। কেউ যদি এই সম্পর্ক মেনে না নেয় তাহলে বন্ধুত্ব নষ্ট হবে এই ভয়ে কেউই সামনে এগুতে চাইনা। বন্ধু-বান্ধব সকলে জানে যে দুজন দুজনকে ভালোবাসে। শুধু ওরা দুজন জানেনা যে তাদের বন্ধুরা সকলে ওদের মনের কথা জানে।

“আজ ক্লাস শেষে লাইব্রেরীতে দেখা করবি“। সকাল মেঘ কে কলেজে গিয়ে বলে।

কেন?

“কথা আছে”।

“এখন বল”।

“লাইব্রেরীতে আয় তারপর শুনিস”।

সকাল মাথা নেড়ে হ্যা-সূচক ইঙ্গিত করল।

তারপর একটা মুচকি হেসে মেঘ ক্লাসে চলে গেল। সকালও ক্লাসে চলে গেল।

ক্লাস শেষে সকাল ও মেঘ যথাসময়ে লাইব্রেরীতে এসে হাজির হল। তারপর একটা নিরিবিরি জায়গা দেখে সামনাসামনি বসে পড়ল।

“কি হয়েছে রে পাগলা? মেঘ জিজ্ঞাসা করল।

সকাল একটু আমতা আমতা করে-

“মেঘ কি করে যে কথাটা বলব বুঝতে পারছিনা। তুই আবার কি ভাববি এই চিন্তা করছি”।

“আর ভনিতা করতে হবেনা। তোর আবার লজ্জা!” বিদ্রুপের সুরে মেঘ বলল।

“না মানে। একটা কথা বলব রাখবি?”

“আর মানে মানে করতে হবেনা। যা বলার চট করে বলে ফেল। তুই একটা বলবি আর আমি রাখবোনা! তাই কি হয়?”

“সত্যি! আমার কথা রাখবি?”

“আরে ঠিক আছে, রাখবো। এবার কি বলবি না আমি চলে যাব?”

“আসলে সত্যি কথা বলতে কি, একটু থেমে যায় সকাল।

“আবারও? আমি গেলাম”।

বলে উঠতে যাবে এমন সময় সকাল তার হাত চেপে ধরে। মেঘ পিছন ফিরে তাকাতেই

“আমি তোকে খুব ভালবাসি”। বলে মুখ নিচু করে সকাল।

“কি! কি বললি তুই! আবার বল”। কিন্তু সকাল মাথা নিচু করে বোবার মত বসে থাকে। আর মেঘ মিটমিট করে হাঁসতে থাকে। তারপর সকালের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তার চিবুক হাত দিয়ে তুলে ধরে বলে

“ওলে বাবালে খোকা লজ্জা পেয়েছে। এই আমার দিকে তাকা। তাকা বলছি”। সকাল এবার মেঘের দিকে তাকায়। কিন্তু কিছু বলেনা।

“আমিও তোকে ভালবাসি”।

একথা শোনার পর সকাল তার নিজের কান কেও বিশ্বাস করতে পারছিলনা। আবেগে মেঘ কে জড়িয়ে ধরে বলল

“সত্যি তুই আমাকে ভালবাসিস?

হ্যাঁ, সত্যি, সত্যি, সত্যি। আমি শুধু ভয়ে তোকে বলতে পারিনি”।

“ওরে ফাজিল নিজের কথা আমার কাছ থেকে আগে জেনে নিলি?”

“বেশ করেছি , ঠিক করেছি। তোর মনের কথা আগে জেনে নিয়েছি”।

“আমরা আগে থেকে জানি”। হঠাত এমন কথা শুনে দুজনে যেন ভুত দেখার মত ভয় পেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে তার বন্ধুরা মিটমিট করে হাঁসছে।

“এখানে বসে ভালবাসার রঙ্গলীলা হচ্ছে তাইনা? মুর্তজা বলে তেড়ে আসে। -আমরা সব শুনেছি।

এগুলো শুনে দুজনেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। যেন পালাতে পারলেই বাঁচে।

তারপর থেকে দুজনার পথ এক হয়ে গেল। কলেজ ক্যাম্পাসে কেউ আসুক বা না আসুক এই প্রেমিক যুগলকে অবশ্যই দেখা যাবে। কলেজের সবাই জানত সকাল আর মেঘ একে অপরকে কতটুকু ভালবাসে। তারা দুজন দুজনকে এমন ভালবাসত যে কেউ তাদের সম্পর্কে খারাপ বললেও তারা বিশ্বাস করত না। অনেকে চেষ্টা করেছে তাদের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরাতে কিন্তু তারা তাদের কথায় কোন পাত্তায় দিত না। তাই এখন আর কেউ তাদেরকে ঝামেলা করেনা। বরং যদি পারে সাহায্য করে। তারা বুঝে গেছে এদের ভালবাসা এত মজবুত যে কেউ তা ভাঙতে পারবেনা।

ক্লাস শেষে বাড়ি যাবার সময় মেঘ সকালকে ডেকে বলল

“আগামীকাল একটু সকালে কলেজে আসিসতো।

“কেন?

“আয় তারপর বলবো। আর শোন আগামীকাল থেকে আর তুই নয় তুমি করে কথা বলবো দুজনে। মনে থাকবে?

“আচ্ছা ঠিক আছে। বলে হাঁসতে হাঁসতে দুজনা বাড়ির পথ ধরল।

মেঘের বাড়ি কলেজ থেকে বেশি দূরে নয়। মুর্তজা ও সকালদের মেস থেকে সামান্য একটু দূরে। পায়ে হেঁটে গেলে পাঁচ মিনিটের পথ। সকাল ও মুর্তজা একই মেসে থাকে। প্রথমে মুর্তজা থাকত পরে সকালের সাথে বন্ধু সম্পর্ক হবার পর তাকে কাছে এনে রেখেছে। দুজনে একে অন্যের জন্য অন্তপ্রাণ। মুর্তজার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের একটি ছোট্ট গ্রামে। সে সেখান থেকে এসে মেঘের সাথেই একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে। তাই তারা খুবই ভাল বন্ধু সেই থেকে।

সকাল পরেরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসলো কিন্তু পড়ায় মন বসাতে পারল না। শুধু বারবার কলেজে যাবার জন্য মনটা ব্যকুল হয়ে উঠতে লাগল। উঠে নাস্তা সেরে কলেজে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগল। মুর্তজা তখনো ঘুমাচ্ছিল তাই তাকে আর না ডেকে একা একা কলেজে যাবার উদেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। পায়ে হেঁটে সে কলেজে এসে পৌঁছাল। তখনো কেউ কলেজে আসেনি। তবে কলেজের প্রধান ফটক খোলা রয়েছে। কলেজের ভিতর ঢুকেই সকাল চমকে উঠল। এত সকালে মেঘ কলেজে চলে এসেছে! আজ আর রক্ষে নেই। চুপিচুপি কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সকালকে দেখে মেঘ অভিমানে অন্যদিকে ফিরে দাঁড়াল। সকাল মেঘের আরো কাছে গিয়ে তার হাত ধরে বলল-

‘দেরি হয়ে গেছে সোনা।‘

‘দেরি হয়ে গেছে সোনা।‘ মুখ ভেংচে মেঘ সকালের কথার পুনরাবৃত্তি করল।

‘আমি সেই কখন থেকে উনার জন্য অপেক্ষা করছি আর উনি এখন এলেন।”

“ আচ্ছা ম্যাডাম ঠিক আছে আর কখনো দেরি হবেনা। এই কান ধরছি, নাক ধরছি”।

মূহুর্তে মেঘ সকালের হাত ধরে করুন স্বরে বলল

“সকাল তুমি হয়ত জান না আমার ধ্যান-জ্ঞান সবই তুমি। তুমি একটু চোখের আড়াল হলেই আমার ভয় হয় যদি তোমাকে আমার জীবন থেকে হারিয়ে ফেলি। তুমি হারিয়ে গেলে আমি আর বাঁচব না। কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে নাতো, কথা দাও”।

“ আচ্ছা কথা দিলাম তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও হারাবোনা। তুমি আমার প্রাণ আমি কেন তোমাকে ছেড়ে যাব বল”। সকাল মেঘকে জড়িয়ে ধরে বলল “ আমি সারাটা জীবন আমার এই বুকের মধ্যে তোমাকে আগলে রাখব। কোথাও হারিয়ে যাব না। মেঘ সকালের বুকে মাথা রেখে বলল “ আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না। আমি শুধু তোমার ,শুধুই তোমারি”। এই মনে আর কারও স্থান হবেনা। এই মনের একমাত্র দাবিদার তোমার, অধিকারও তোমার, আর কারও না।

সকাল মেঘের মুখটা দুহাতে আলতো করে ধরে বলল “ আমি জানি তুমি আমার আর অন্য কারো না, আমিও তেমনি তোমার অন্য কারো না। এবার বল তোমার কি কাজ আছে বলেছিলে?”

“ওহ! সে কথাতো ভুলেই গেছি”। ব্যাগে হাত দিয়ে একটা রেপিং করা কি যেন বের করল মনে হয় বই আর একটা শপিং ব্যাগ। তারপর সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল “ এটি আমার তোমাকে দেয়া “প্রথম উপহার”। তোমাকে দেবার মত অনেক কিছুই ছিল কিন্তু আজকের দিনটিকে স্বরনীয় করে রাখার জন্য আমার এই ছোট উপহার। আমার পছন্দের একটা বই আর তোমার পছন্দের সাদা রঙয়ের একটা টি-শার্ট। শুধু তোমার জন্য।  সকাল হাত বাড়িয়ে সেটা নিল এবং মেঘের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল “পাগলি একটা, এর জন্য এতকিছু!”।

এইচএসসি ১ম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার (ইয়ার ফাইনাল) দিন এগিয়ে আসছে। পরীক্ষার আর বেশিদিন নেই। সকলেই পড়ার টেবিলে দিন-রাত বই নিয়ে অধ্যায়নে ব্যস্ত। সকালেরও তাই পড়ার খুব চাপ। কলেজের ক্লাস আর শিক্ষকদের কাছে টিঊশনের পর দিন ফুরিয়ে যায়। রাত নেমে আসে তার প্রকান্ড বাহু মেলে। তেমনি সকালের চোখেও নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। ঘুমকে দূরে সরিয়ে বসতে হয় পড়ার টেবিলে। ভাল ফলাফলের জন্য শিক্ষার্থীদের কত কি যে করতে হয়। সকাল ভাবে আর এভাবেই পড়ে চলে প্রতিরাতে।

সকাল তার পড়ার টেবিলে কম্পিউটার সাজেশন খুঁজছে। কিন্তু তার টেবিলের কোথাও তার হদিস পেল না। অগত্য কি আর করা খুঁজতে খুজতেই মুর্তজাকে জিজ্ঞাসা করল “ এই মুর্তজা আমার কম্পিউটার সাজেশনটা কইরে, তুই নিয়েছিস?”

“ না, আমি নিইনি, তুই না সেদিন জাহিদকে দিলি। তোর মাথা গেছে। ডাক্তার দেখা।“

“ভুলতো মানুষেরই হয়, একটা কথা জিজ্ঞাসা করলাম শুনিয়ে দিল এত্ত কথা। বলে দুজনেই হাঁসিতে ফেটে পড়ল।

“ এই মুর্তজা শোন, আজ সন্ধ্যায় তাহলে জাহিদের মেসে গিয়ে সাজেশনটা নিয়ে আসব, কেমন?”

“আচ্ছা” বলে মুর্তজা সম্মতি জানালো।

সকাল আজ মেঘের দেয়া টি-শার্টটি পরেছে। উপহার দেয়ার পর একদিনও পরেনি আজই প্রথম পরল। এজন্য অবস্থা মুর্তজার টিপ্পুনি মার্কা হাসি সকালের চোখ এড়াইনি। মেঘদের বাসার দুই/ তিনটে বাসার আগে সকালের বন্ধু জাহিদের মেস। জাহিদের সাথে সেখানে সকালের বন্ধু রাজীব, কামাল এবং রাহাতও থাকে। সন্ধ্যায় মুর্তজাকে নিয়ে সকাল জাহিদের মেসে গিয়ে জাহিদকে বকাবকা শুরু করল। পরে জাহিদ তাকে অনেক অনুনয় করে ঠান্ডা করল। সাজেশন দিতে ভুলে গেছে তার জন্য জাহিদ ক্ষমা চেয়ে নিল। তারপর গল্পে গল্পে কেটে গেল অনেকক্ষণ। এবার উঠার পালা। কিন্তু হঠাত কান্না আর চেঁচামেচির আওয়াজ পেল তারা। সকাল সকলের উদ্দেশ্যে কি হয়েছে রে, কে কাঁদছে চলতো বাইরে গিয়ে দেখি।

সকালের সাথে সকলে “চল” বলে বাইরে বেরিয়ে আসল। চারিদিকে তাকিয়ে, কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কান্নার শব্দ কোথা থেকে আসছে।

জাহিদ বলল- “কান্না হয়ত মেঘদের বাড়ির ঐদিক থেকে আসছে। চলতো গিয়ে দেখি। কার কি হল”।

যেই বলা সেই সকলে মিলে চলল কান্নার শব্দ অনুসরণ করে। গিয়ে থামল মেঘের বাসার সামনে। কান্নার শব্দটা মেঘের বাসা থেকেই আসছিল। তারা দেখে অনেক লোকের ভীড়। বাসার ভিতরে প্রবেশ করল তারা সবাই। সাবার আগে সকাল ভিতরে প্রবেশ করেই একজনকে জিজ্ঞাসা করল-“এখানে কি হয়ছে? এরা কান্না করছে কেন?” এসময় একজন বলল-“ আমাদের মেঘকে সাপে কেটেছে”।

মেঘের নাম বলার সাথে সাথে সকালের মাথাটা ঘুরে গেল, মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। মুর্তজা সকালের পিঠে হাত দিতেই সকালের চোখ ছলছল করে উঠল। সকাল আর থাকতে পারলোনা মানুষের ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। গিয়ে দেখে একটা চৌকির উপর যন্ত্রনায় ছটফট করছে মেঘ। চারিদিকে ঘিরে আছে ওদের বাসার মহিলারা। পাশে একজন মহিলা কাঁদছে হয়ত ওর মা। কারণ এর আগে সকাল কখনও ওর মা কে দেখেনি। সকালকে দেখে মেঘ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সকালও থাকতে পারলোনা। তার চৌকির পাশে তার মাথার কাছে গিয়ে বসলো। জাপটে ধরলো মেঘের হাত। কিছুই বলতে পারলোনা শুধু দুজনে দুজনার দিকে চেয়ে কাঁদতে লাগলো। জলের বন্যা বয়ে যেতে লাগলো দুজনার চোখে।

সকাল শুধু বলল-“ কি করে হলো এসব?”

খুব কষ্টে মেঘ বলল-“ ঘরে বসে পড়ছিলাম হঠাত পায়ে সাপে কামড় দিল” বলতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল তার। এই কষ্ট অনুভব করে সকাল মেঘকে চুপ করে থাকতে বললো। আর মুর্তজাকে ডাক্তার আনতে বললো। মুর্তজা বেরিয়ে গেল।

খুব কষ্ট করে মেঘ বলতে লাগলো-

“ জীবনের শেষ বেলায় তোমাকে দেখে যেতে পারলাম এবার তোমার কোলে মাথা রেখে মরলেও আমার সুখ”।

সকাল মেঘের মুখে হাত রেখে চুপ করে থাকতে বলল।

মেঘ তাকে বাধা দিয়ে বললো-“ সকাল আমার সময় শেষ। আমাকে শেষবারের মত মনের কথাগুলো বলতে দাও”।

“তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? চুপ করো। তোমার কিছু হবেনা। আমি তোমাকে আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে দেবনা”।

“সকাল, পাগলামো করো না। বড় আশা ছিল সারাজীবন তোমার পাশে থাকবো। সে আশা আর পূরণ হলো না। আমি তোমার হতে পারলাম না। একদিন বলেছিলাম আমি শুধু তোমারি। আর কেউ এই মনের অধিকারী না। কিন্তু আজ সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। আমি আমার কথা রাখতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করো মনে রেখ না আর আমাকে”।

সকাল আর থাকতে পারলো না কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে উঠল “মেঘ, তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পার না। আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? তুমি ছাড়া আমি বড় একা”।

মেঘ সকালের হাত ধরে আছে। ক্রমশ তার কণ্ঠ নিস্তেজ হয়ে আসছে। কথা অস্পষ্ট হতে লাগলো। বিষে সমস্ত শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রনায় কাতরাতে লাগলো। তারপরও সকালের হাত খানা শক্ত করে ধরে সে বললো-“ সকাল আমার মাথাটা তোমার বুকের মধ্যে শক্ত করে ধরো”। সকাল মেঘের কথা মত তার মাথাটা আলতো করে বুকের মাঝে চেপে ধরলো। মেঘের আর কথা বলার শক্তি নেই। আস্তে আস্তে সে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে ফেনার সাথে রক্ত বের হতে লাগলো। সকাল তার টি-শার্ট দিয়ে তা বারবার মুছে দিতে লাগলো। আর কোন কথা নয় শুধু দুজনা দুজনার দিকে চেয়ে চোখে অশ্রুর শ্রাবন ধারা বইতে লাগলো। মেঘ এক দৃষ্টিতে সকালের দিকে চেয়ে রইল। তারপর খুব কষ্টে একটু হাসলো। সেই হাসি মাখা মুখের দিকে সকাল তাকিয়ে রইল। মেঘের চোখের কোনা বেয়ে জলের ধারা বয়ে যেতে লাগল। নিস্তেজ হয়ে গেল মেঘ। চারিদিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। সকাল বোবার মত মেঘের নিথর দেহটাকে বুকে জড়িয়ে বসে রইল। বইটা যত্ন করে ব্যাগের মধ্যে রাখলো আর টি-শার্টে লেগে থাকা মেঘের রক্তমাখা ভালবাসার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে তা ব্যাগের মধ্যে রেখে ব্যাগ গুছিয়ে নিল। তারপর ব্যাগ ঘাড়ে করে বাইরে বেরিয়ে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল। এবার এগিয়ে যাবার পালা তাই নিজের গন্তব্যে চলল সকাল। কত স্মৃতি, কত ভালবাসা, কত কষ্ট আর কত হাহাকার পিছন থেকে ডাক দিচ্ছে। সেদিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল সকাল পেছনে পড়ে রইল সব। 

ঈদের স্মৃতি-খাদিজা ইতু

ছোট্ট বেলার ইদের কথা খুব যে মনে পড়ে,

রাত থম্থম রাতের শেষে সকাল কখন হবে

মনের ভিতর ঈদের খুশির জোয়ার বয়ে যেত।

ঈদের খুশি ইদের আমেজ ইদের চাঁদ দেখে

ফিরনি সেমাই পায়েশ মিঠাই খাব বেশি ভেবে

ভোর না হতে ঘুম ভাঙ্গত ঈদের পোষাক পেতে

চান্নি রাতে বাবা মোদের পোষাক  আনত কিনে

নতুন পোষাক কিনে বাবা ফিরতো গভীর রাতে

পথের দিকে চেয়ে থেকে চোখ যে ঘুমে ঢোলে

একটি সময় ঘুমিয়ে যেতাম পথটি বাবার চেয়ে

সকাল  না হতেই  নতুন পোষাক সামনে নিয়ে বসে

দু” তিন ঘন্টা কাটিয়ে দিতাম নতুন পোশাক পেয়ে।

মা যে আমার গোসল সেরে রান্না ঘরে যেত

ফিরনি সেমাই জর্দ্দা পায়েশ রাধতো মজা করে।

নদীর ঘাটে গোসল করতাম হাবিব সাবান দিয়ে

গোসল সেরে নতুন জামা পরতাম আনন্দ করে।

বুবু  মোদের সাজিয়ে দিত স্নো পাঊডার আলতা লিপিষ্টক দিয়ে।

তারপরই যে মজার সময় আসতো সবার মাঝে

ঈদ সেলামি পাবার আশায় ফিরতাম দ্বারে দ্বারে

বড় ভাই আর দুলাভাইয়ের নতুন টাকা পেয়ে

নতুন টাকার গন্ধ নিয়ে  লাগতো দোলা মনে

ছুটতাম সবে ঈদের মেলায় হরেক জিনিস দেখা

পিয়াজু,পাপড় বাদাম কিনে মায়ের জন্য আনা

বাশি, খেলনা কিনতাম কত দু’ চার আনা দিয়ে

বন্ধু বান্ধব ঘুরতাম সবে নতুন পোশাক পরে।

ঘোরাঘুরি খেলাধুলায় দিনটি যেত চলে

কী যে মজাই কাটত মোদের ঈদের দিনটি ধরে

এমন মজা পাই না যে আর ছোট্ট বেলার মত।

মায়ের হাতের ফিরনি পায়েশ খাই না কতকাল

মা যে আমার হারিয়ে গেছে ফিরবে না যে আর

নতুন পোশাক পাবার আশায় থাকতে হয় না আর

বাবাও আমার হারিয়ে গেছে কিনবে না আর পোশাক

ছোট্ট বেলার ইদের মজা লাগবে না যে আর।

সুখ-অজিত কুমার বর্মন

হাত বদলেই মূল্য বোঝা যায় টাকার,

মন ও শরীরের অসুখ হলে বোঝা যায় ঘুম ও সম্পর্কের গুরুত্ব।

গ্রামে না গেলে বোঝা যায় না মাটি ও মানুষের একাত্মতা।

অনেক কষ্টে পাশ করে তারা সম্মানিত হয় বহু,

সময় মতো কেউ থাকেনা পাশে, প্রতিশ্রুতির জোয়ার আসে শুধু।

তারপরও তো বেঁচে আছি, স্বপ্ন ঝড়ে ফাগুন রঙা খরায়,

 অকাল বর্ষা দুঃখ বয়ে আনে, নিদ্রাহীন রাত, অভাব শুধু ছড়ায়।

সময় মতো বর্ষা এলে তবে, কুড়িগুলো ফুল হয়ে ডাল ভরে;

মাটির ঘ্রাণে মন ভরে যায়, সুখ আসে যে ঘরে।।

মন ঝলমল ঝরে-হুমায়ূন কবীর

রোজা নয় সোজা

কষ্টের বোঝা

সারাদিন যেতে হয় বয়ে।

শরীর আর মনের

যুদ্ধ চলে।

পেটে লাগে খুধা

বুকে নেই সুধা।

মন ভেঙে পড়ে।

আবারও গড়ে।

ভেঙে আর গড়ে

উঠে আর পড়ে।

মরতে মরতে বেঁচে থাকা।

চোখ নত রেখে

মন থেকে, থেকে

হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা

রাগের নাগিনী ফণা

কাফনে মুড়ে

কঠোর সিয়াম সাধনা।

বিশ্বের ঘরে ঘরে

মুসলিমে করে

একমাস ধরে।

সূর্যের মতো পুড়ে সারাদিন,

চাঁদের মতো করে প্রতিদিন

পূর্ণিমার আনন্দ নিয়ে এলে

 ইফতার, সব কষ্ট যায় ভুলে।

উৎসবে মন নেচে ওঠে।

অবসন্নতা যায় টুটে।

চলে সংযম, উৎসব

পুরো একমাস ধরে।

মুসলিমের ঘরে ঘরে।

অবশেষে ঈদ এসে

পরিপূর্ণ বেশে,

ঝকমক ঝকমক

চারিদিকে চকমক

টলমল টলমল করে।

মন ঝলমল ঝলমল ঝরে।

আশ্রয় চাই -রাম কৃষ্ণ বিশ্বাস

তোমার তরে আর কে আছে

আমার আপনজন?

তোমার আশীষ সবসময়ই,

আমার পরে থাকে, বর্শিত সরল।

কিন্তু আমি তোমার বাছা

স্বার্থ নিয়েই থাকি সদা

তোমায় ভাবি সুযোগমত

বিপদে যখন হই উপনীত।

সদা সময় আপন মনে

চলি জীবন রেখায়,

বিপদ যখন সামনে আসে

অন্ধজনের আলোর মত

তোমাকেই, ভাবি সারাক্ষণ।

তোমার চলে না কোন তুলনা

সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের তরে

জগৎ মাঝে সমান থাকো,

তোমার সৃষ্টিকে সাথেই রাখো

আমি ভাবি, তুমিও আমার মত হলে

আমার অবস্থা তখন কী হবে?

আমায় তুমি দিয়েছো যা

পেয়ে ভাবছি আমার যোগ্যতা

তোমায় মনে নেইনি আমি,

আমি যে তোমার অজ্ঞ জ্ঞানি

আমায় ক্ষমে, আপন গুণে

আশ্রয় দাও, তোমার পাদ্পদ্মে।

মিনতি আমার রাখ প্রভু

আমি যেন তোমায় ছাড়া, না হই কভু।।

গল্পের পরিসমাপ্তি-গোলাম মোস্তফা মুন্না

ন্যাটোর সদস্য হতে চায় ইউক্রেন

শ্রীলঙ্কায় মানুষের মধ্যে প্রচন্ড অভাব

নিস্তার মেলেনি করোনা থেকে

প্রকৃততে শান্তি মিলছে না

শব্দ মিলছে না কবিদের লেখায়

আবোল তাবোল যা পারছি

তাই গাইছি ভোর হতে

সময়ের সঙ্গতি অসঙ্গতি ঢের বসেছে

স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জন বর্ণের ঘাড়ে

নিত্যানন্দের বাজেট থেকে চন্দ্রবিন্দু খসে খসে পড়ছে

আর বলছে, খুব খুব সুন্দর। চমৎকার, বাহ দারুন ইত্যাদি

ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, টুইটার, ওয়াটআপ

ভরে ফেলেছে বে সুরের বর্ণ

সকাল না হতে -দিন, তারিখের ব্যাগ

ঝুলিয়ে ঘাড় বেকিয়ে চলছে সপিংমল

আর বড় বড় ক্যামেরার সামনে

বোঝ না আর বোঝ সবই অষ্টধাতুর কবিতা

আংটি পরা গল্পের সমাপ্তি

তুমি থামো, এবারকার মত থামো। আমি আসছি তেমন

বলতে চেয়েও থেমে গেল পাশের বাড়ির বট বৃক্ষ

দর্পণ-প্রনব ঘোষ

তোমায় আমি দেখেছিলেম হঠাৎ

অন্ধ গলির শেষে ভাঙা বাড়ি,

খোলা জানলার ফাঁক দিয়ে আয়নায়

দেখি তোমার পরনে লাল শাড়ি।

আয়নাতে ঐ মুখটা তোমার দেখি

জ্বলজ্বলে রূপ, পটলচেরা আঁখি

মুক্তকেশী চুল গুলি সব বুকের উপরে

মুক্তাদানা জমেছে যেনো রাঙা অধরে!

পড়লো যখন হঠাৎ চোখে চোখ—

লজ্জায় রাঙা হলো যেনো রক্তজবা মুখ

সহসা আমার হার্টবিটটা দ্রুতগামী হলো

মন ছুটিল— পা দু’খানি স্থির তবু ছিলো।

হঠাৎ যখন তোমার কথা মনেতে উঠিল

তাকিয়ে দেখি শূন্য ঘর অস্পষ্ট আলো—

তখন আমি আত্নহারায় দেখি উদাস মনে

পড়ে আছে মুখখানি মোর ভাঙা দর্পণে।

মন চায় -শেখ হামিদুল হক

মায়াময় পৃথিবীর ছায়াপথে

এগিয়ে চলেছি অজানার দিকে,

বৈরাগী রাতের সীমানা ছাড়িয়ে যুবতী

সকাল ভালোবাসার শিশির জড়িয়ে রাখে

তোমার সোহাগি ভালোবাসার মত।

আমাদের ভালোবাসা গোলাপের পাপড়িতে

দোল খায়,

আদুরে স্বপ্ন মাছরাঙা ঠোঁটে বাতাসের

শূণ্যতায় ভেসে যায়,

মন চায় তোমার বুকের মাঝে আদরের

কাশফুল বিছিয়ে দিতে,

পূর্ণিমার আলোর বুকে নির্লিপ্ত ভালোবাসার

পাঠশালায় খুঁজে পাই পূর্ণতার ঠিকানা।

ধনী গরীবের ঈদ-রাশিদা আখতার লিলি

বড় লোকের ঈদ মানে
ফিরনী, পোলাও, জর্দা ভাতের
ঘ্রাণে বাড়িময় ভরপুর।
আনন্দ উল্লাসের জলসা।

বড় লোকের ঈদ মানে
নামীদামী  গাড়ীতে চড়ে
নতুন নতুন কেনাকাটায় মশগুল।

বড় লোকের ঈদ মানে
রঙে,ঢঙে,ফ্যাশনে
হাজার হাজার টাকার অপচয়।
অথচ গরীবের কান্নায়
গলে না হৃদয়।

গরীবের ঈদ মানে
চাঁদ দেখার পর থেকে
সারা রাত জেগে থাকা।
কত আশা কত ভাষা বুকে নিয়ে,
শুধু কল্পনার তাজমহল গড়া।
ছেলেমেয়েদের পাতে
একটুকরো মাংস
জুটবে কি,জুটবে না,
এই নিয়ে কত ভাবনা।

অবশেষে ভোর হয়, গরীব বাবা গোসল সেরে
পুরানো পান্জাবী পাজামা পরে ঈদগাহে যায়।
দুটাকার লাল ফিতা আর পাঁচ টাকার জিল্যাপী কিনে
গরীব বাবা এসে বলে  –
অনেক কিছু এনেছি চন্দন।
ওদের মাঝে তবুও আছে
অনেক স্নেহ আদর,ভালবাসার বন্ধন।

ইন্টারভিউ জীবন অতঃপর -ড. শাহনাজ পারভীন

ইফাজ ইন্টারপ্রাইজের উত্তেজনাকর ভাইভা বোর্ডের সকল সদস্যই সক্রিয়। বোর্ডের সভাপতিসহ  প্রতিটি সদস্যেরই রয়েছে ব্যক্তিগত পছন্দের ক্যা-িডেট। তুলকালাম কা- চলছে একেকজন প্রার্থীর ভাইভাতে। কে কার ক্যান্ডিডেটকে পেছনে ফেলে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে পারেন তার প্রতিযোগিতায় ভিতরে ভিতরে কন্টকাকীর্ণ। ইফাজ ইন্টারপ্রাইজের ইঞ্জিনিয়র থেকে শুরু করে প্রাইভেট সেক্রেটারী এবং ইফাজ ব্রিক্স এর ম্যানেজার,  ড্রাইভার, কেয়ারটেকার থেকে ক্লিনারসহ প্রায় পঞ্চাশজনের নিয়োগদানের জন্য তিনটি বোর্ড বসেছে নিজস্ব হলরুমে। দেশের বাঘা বাঘা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে একেবারে স্বশিক্ষিত মধ্যবয়সী নারী-পুরুষ  পোর খাওয়া জীবনকে পেছনে ফেলে এতে অংশ নিচ্ছে।

ইফাজ ইন্টারপ্রাইজের প্রধান উপদেষ্টা এই তিনটি বোর্ডের প্রধান কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ. ডি ডিগ্রিধারী অত্যন্ত  সুন্দরী স্মার্ট  ড. আবেদা সুলতানা বোর্ডগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছেন।  তীক্ষè দৃষ্টিতে ভিডিও করছেন ভাইভা বোর্ডের চলচ্চিত্র। তিনি প্রথমেই প্রথম বোর্ডটাতে ঢু মারেন। ওখানে একজন প্রতিযোগীকে প্রথম প্রশ্নটা করছেন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা-

: আপনি তো সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন। বলুন তো, নাইপলের ‘জেসমিন ফুল’ আর ‘ জেসমিন’ শব্দটির মধ্যে মূল পার্থক্যটি কোথায়?

: ধন্যবাদ, এটা এমন একটা উপমা যেমন ‘ডেফোডিল’ না দেখে উডস্ওয়ার্থ পড়ার মত। বিষয়টি আমি আর একটু ক্লিয়ার করার চেষ্টা করছি। যেমন সাঈদ লিখেছেন নাইপলের একটি প্রবন্ধে আছে- লেখক ব্রিটিশ গায়ানার একটি বাগানে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে একটি ফুলের নাম। যেই ফুলটির গন্ধ তার চেনা। একজন বয়স্ক মহিলা বললেন-আমরা একে জেসমিন বলি; নাইপল বলছেন-তার মানে আমি এই ফুলটিকে অনেক বছর ধরে চিনি। আমার কাছে এতদিন এই নামটি বইয়ের শুধু একটি শব্দ যা আমি চিনতাম…। কিন্তু ফুল আর শব্দটি আমার মন থেকে দীর্ঘদিন বিচ্যুত থাকার ফলে আমি এই ফুল এবং তার গন্ধকে এক সঙ্গে করতে পারি নি।

আমাদের জীবনে এর সাদামাঠা ব্যাখ্যা আছে। জেসমিন- শেফালি  যেটাই বলি না কেন মূলত আমাদের ঐতিহ্যের শেকড় থেকে আস্তে আস্তে সরে আসা।

: চমৎকার! আপনি মূল জায়গা ধরে টান দিয়েছেন। এবার পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে কিছু বলুন। বিশেষ করে এর চেতনা…

: ধন্যবাদ। পহেলা বৈশাখের শেকড় ঠিক কবে আমাদের চেতনার সাথে মিশেছিল তার সঠিক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ষোড়শ শতাব্দিরও পরে অষ্টাদশ শতাব্দিতে আমরা ভারত চন্দ্রের কাব্যে  বৈশাখের বন্দনা পাই। ষোড়শ শতাব্দিতে মুকুন্দরাম লেখেন-

‘ধন্য অগ্রহায়ন মাস

ধন্য অগ্রহায়ন মাস’ অগ্রহায়নকে কেন্দ্র করেই। আর ভারতচন্দ্র লেখেন- ‘ বৈশাখ এদেশে বড় সুখের সময়’ সেই থেকেই বাঙালির প্রাণের উৎসব এটি। বিশেষ করে এদেশের সবচাইতে ধর্মনিরুপেক্ষ সর্বপ্রধান অনুষ্ঠানের পরিধি লাভ করেছে বৈশাখ।

ভাইভা বোর্ডের অন্য সদস্যরা বুঝতে পারছিলেন না ইফাজ ইন্টারপ্রাইজের প্রাইভেট সেক্রেটারিয়েট পদটার জন্য এ প্রশ্নগুলো কী খুবই প্রাসঙ্গিক কিনা? অন্য একজন কর্মকর্তা সুযোগ বুঝে অন্য প্রশ্নটি মেলে ধরেন।

: আচ্ছা, আপনার রেজাল্ট তো খুব ভালো। আপনি অন্য কোন প্রফেসনে না যেয়ে প্রাইভেট ফার্মের দিকে ঝুঁকলেন কেন?

: এই রকম একটা প্রাণোস্পর্শী প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আগাগোড়াই শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ছিল আমার। এজন্য সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করলাম। লেখক হয়ে উঠারও চেষ্টা রয়েছে। লেখক হওয়ার জন্য শিক্ষক পদটা বড় প্রয়োজন। কিন্তু মায়ের যা সম্বল ছিল তা বিক্রি বাট্টা করে ইউনিভার্সিটির শেষ ধাপটা পার করিয়েছেন। পড়ানোর চাকুরিটার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকার যোগান দিতে সে অপরাগ। তাই ইচ্ছের বিরুদ্ধেই এখানে আসা।

: তার মানে আপনি এর চেয়ে কোন ভাল চাকুরি পেলে এটাতে ইস্তফা দিতে পিছপা হবেন না?

: বিষয়টা ঠিক ঐ রকম নয়, তবে… তাছাড়া এখানে আমার যোগ্যতার মূল্যায়ণ হবে বলে আমার বিশ্বাস।

মেয়েটির সপ্রতিভ  উত্তর আবেদা বেগমের বেশ ভাল লাগলো । এখানকার সদস্যরাও বেশ অভিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে তার। উনি পায়ে পায়ে এগিয়ে যান দ্বিতীয় বোর্ডটাতে।

দ্বিতীয় বোর্ডের ক্যান্ডিডেটদের মৌখিক পরীক্ষা শেষে প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার জন্য আনা  হয়েছে ইফাজ ইন্টারপ্রাইজ মালিকের বাসা ঝিঙেফুল’ এ। এখানে পাঁচতলা মুল বিল্ডিং এর  দোতলা বেশ খানিকটা বাড়ানো।  পদ্মা ইঞ্জিনিয়ারিং এর এক্স এন ইঞ্জিনিয়র নিজে হাতে করেছিল এর প্লান। ম্যানেজার, সুপারভাইজার, টিউটর,  ড্রাইভারের জন্য এ্যাটাচ্ড বাথ, বারান্দাসহ চারটে রুম। নীচের অংশে গাড়ি রাখবার ব্যবস্থা। বেশ ঘোরানো, পেঁচানো। ওখানেই মালিকের নিজস্ব সসার জীপ, ওয়াইফ- বাচ্চাদের জন্য দুটো মার্সিডিজ।ওখান থেকে যে একটা গাড়ি কোন ঝামেলা ছাড়াই সুন্দর ভাবে একবারে বের করে আনতে পারবে  তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। এজন্য সকলেই তাদের শ্রেষ্ট কৌশলের আশ্রয়ে নিজেদের মেধার পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত।

অন্য আর একটা বোর্ডের দিকে পা বাড়ান ড. আবেদা সুলতানা। তৃতীয় বোর্ডটাতেও  ইন্টারভিউ নিতে সকলে মহা ব্যস্ত। 

: আপনার নাম?

: আমেনা বেগম। তয় আমারে সবাই আমিরন কয়।

: পিতার নাম?

: ইমান আলী বিশ্বাস।

: আপনি দরখাস্তে উল্লেখ করেছেন আপনার বয়স ত্রিশ। এটা কী ঠিক? আমার তো মনে হয়…

: ছার এডাই ঠিক। আমার বয়েস ত্রিশ অইবেই। হ, ছার যুদ্ধু তো আমি দেকছি।

: যুদ্ধ দেখছেন মানে ’৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ?

: হ ছার, তহন তো আমার বিয়ে অইচে।

:  বিয়ে হয়েছে মানে? তার কতদিন আগে আপনার বিয়ে হয়েছে?

: তহন আমার ছেলেডা আর মেয়েডা অইচে। আর যেই ছেলেডা বুবুক্কে মরলো হেইডা ছিল প্যাডে।

: তার মানে যুদ্ধের বছর দশেক আগে আপনার বিয়ে হইছে?

: না, না, অত অবে না ছার। যুদ্ধুর সাত বছর আগে আমার বিয়ে অইছে। বিয়ের তিন বছর পর আমার প্রথম ছাওয়ালডা, তার দুই বছর পর মেয়েডা।

: কত বছর বয়সে আপনার বিয়ে হয়েছে?

: অত কি আর মনে আছে ছার? কম বয়সেই বিয়ে অইচে। এখনকার মায়েগের মত গরে বেছন রাকতো না ছার। সাবালক অইছি বার তের বছরে তার তিন চার বছর পরই বিয়ে অইছে।

: বুঝেছি, আপনার বয়স তো পঞ্চান্ন ষাটের মাঝামাঝি কিন্তু চুল তো পাকি নি একটাও…

: কী যে কন ছার, আমার মার তাই পাকিনি। আমার নানীরও পাকিনি। আমার তো তাও একটা দু’একটা পাকছে। পাকপেই বা না ক্যান। নানান চিন্তাই আমার মাথা গরম।

: মাথা গরম হবে না। আপনার বয়স ষাট, লিখেছেন ত্রিশ।

 খেই হারিয়ে ফেলেন যেন ইন্টারভিই নিতে এসে। সামান্য একটা পোষ্ট, এখানেও কত ক্যান্ডিডেটের ছড়াছড়ি, যোগাযোগের দৌঁড়াদৌঁড়ি…

: আমি কি আর অত কিছু জানি ছার? আমারে যা জিগালেন আমি তার উত্তর দিলাম। এইবার আমি আপনাগেরে এট্টা প্রশ্ন জিগাই ছার-

অন্যপক্ষকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই শুরু করে আমেনা –

: আমারে কইছে রানতে অইবো, ঘর অপিস দেখে রাকতে অইবো। অফিসের লোকজন সব খাবে, থাকপে। তা আমার বয়সখান নিয়া অত টানাহ্যাচড়া করতেছেন ক্যান ছার? আমারে জিগান আমি রানবার পারি কিনা? আমি ছার ভালোই গোস -পুলাও- সব পারি। সোয়ামির হোটেল ছিল। আমিই তো সব করতাম। সে সব না, কনে আমার বয়স কত?

আমেনা বেগমের মেজাজখানা চড়ে গেল ওদের কৌশল দেখে। ও তো ভাবছে উনারা ওর জীবন নিয়া গল্প শুনতাছে। তা না, অহন দেহি, গল্পে গল্পে বয়সের হিসাব কষতাছে। তাইলে কী আর ঐসব গল্প করতাম। মনে মনে বলে আমার কী এমন বয়স। বয়স যদি দেখবার চান তো মওলানা সাহেবের বউয়ের বয়স দেহন লাগে। কত যে বয়স…। তার ছেলের বয়স চল্লিশ…তার বয়স পয়ত্রিশ। বোঝো ঠেলা? আমি কি আর তাই নাকি? ঐ যে যুদ্ধু ও তো সবারই জানা। কারো বয়স কেউ ঢাকপার পারবি না। আমেনার নিজের চুল নিজেরই ছিঁড়তে ইচ্ছে করে। চাকরি অবে না, তা না অবে। ঢেকি স্বর্গে গেলিও লাতি খাতি অয়। তো কাম-কামই। বাসা বাড়ির কামও কাম, অফিসির কামও কাম। ঐ অলো। আইছি কম ঠিক করতি আর ঊনরা  বয়েস নিয়ে করছে টানাটানি। কি যে দ্যাশটা অইলো? এই বুড়ো বয়সে আমি বয়েস দিয়ে কি আর করবো?  আমার এক পা তো রইচে গোরে।

: এইবার কন দেহি ছার, আমার চাকরিডা কী অইবো?

আমেনা শান্ত হয়। ভেতরে ভেতরে খানিকটা আশাবাদীও। যা হোক, মুকির উপর দুটো কতা তো কইছে সে।

: আপনার বয়স যদি ত্রিশ হতো, আমরা চেষ্টা করতাম, কিন্তু আপনার বয়স তো দ্বিগুন।

: আবার ঐ একই কতা? আমার বয়েস দিয়ে কী করবেন ছার? একি আর সরকারী চাকরি যে বয়েস লগবি?

: ওসব আপনি বুঝবেন না, এই চাকুরির জন্য আপনি কাকে ধরেছেন?

আমিরণ বিপাকে পড়ে যায়। এইটাতো কওন মানা। কিন্তু উনারা শুনলো কোন জাগাত্তে। মনে অয় উনারা সবই জানেন। মিত্তে কতা কয়েও কোন লাব নেই। এমনিতেও আমিরণ মিত্তে কতা কয় না। এই সৎগুন আছে তার। মনে মনে সাত পাঁচ ভাবে আমেনা।  সে স্পষ্ট বলল-

: কমিশনাররে দরছি ছার। মহিলা কমিশনার গুলজার বেগম আফারে-উনারে কইছি। বোজেন তো বয়েস অইচে। চাওয়ালডা দেহে না। মেয়েডাও গরীর। মা রইচে আমার কাছে। নানী রইচে। কী করব ছার। হঠাৎই হতাশায় আটকে যায় আমিরনের গলা।

: ঐ তো ঝামেলা। কিন্তু আপনার শরীরটাও  বেশ ভারি। এত মোটাসোটা যে বয়সটাও লুকানো যাচ্ছে না। আমরাই বা কি করব বলুন?

গুলজার বেগমের সুহৃদ তরুণ ছেলেটা আমিনা বেগমের মুখে যেন মায়ের আদল খুঁজে পায়।

: একদিকে মালিকের চাপ, অন্যদিকে…। এদিকে আপনাদের চাপ। চাপে চাপে আমরা তো কাহিল।

 নেক্সট…

আমেনা ভাইভা বোর্ড থেকে বেরোতে বেরোতে নিজের বয়সটাকে যেন অভিসম্পাৎ করে-

: হায় আল্লাহ, টাকা, পয়সা, রূপ, যৌবন না বাড়াইয়া শুধু বয়েসটাই বাড়াইলা…

ড. আবেদা বেগম আমেনা বেগমের কথায় হুঁচোট খায়। চোখ যায় নিজের শরীরের দিকে। তার বয়সও আমেনা বেগমের মতই। কিন্তু টাকা- পয়সা, রূপ- সৌন্দর্য সবই বেড়েছে শুধু বয়সটাই যেন বাড়েনি তার!