Home » ঈদ সংখ্যা ২০২২ (page 2)

ঈদ সংখ্যা ২০২২

অভিমুখীন-সুমন বিশ্বাস

এক পা দু’ পা করে এগিয়ে যাচ্ছি

হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলাম থমকে,

আর এগোনো যাচ্ছে না,

হয়তো আর এগোনো যাবে না;

সবকিছু আমার প্রতিকূলে,

এ যুদ্ধে আমি একা।

আদর্শ পাঠশালায় এতোদিন

যা কিছু অন্যায় আর অনিয়ম বলে

জেনেছি  তাই আজ নিয়ম।

এ অনৈতিক নিয়মের মাঝে

আমি অসহায়।

ধ্রুবতারা কিংবা শুকতারা মেঘে ঢাকা।

কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম, ভাবলাম –

এখানে এভাবে থেমে যাওয়া মানে

শুধু পরাজয় নয়- মৃত্যুরও অপমান।

মাথার ভিতর আচমকা একটা ঝড়ে

বসন্তের বাতাস যেন লাগল গায়ে

অন্তর সত্ত্বায় নতুন করে

শক্তি সঞ্চারিত হলো

আমি দৃঢ়চেতা হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম

আগে তো এক পা বাড়াই

তারপর না হয় দ্বিতীয় পাটাও……….

ভালোবাসা ওয়েসিস-রিয়া বণিক

এই নিত্যদিনের মৃত্যু মিছিল, ভালোবাসা বিহীন মরুভূমিতে

তোমার আমার সম্পর্ক এক টুকরো মরুদ্যানের জন্ম দিয়েছে।

সকাল থেকে সন্ধ্যে এক উদ্ধত হিংসার বাতাবরণে জীবন অতিষ্ঠ।

এরই সাথে জোট পাকিয়েছে মহামারী।

কখন যে কার কোন বক্তব্যে দাঁড়ি পড়বে,

জানা নেই কারোর।

ত্রস্ত আতঙ্কিত মানুষের দোরে জীবন-মরণ এক

চাতালেই নাচছে।

যে কদিন বাঁচি, ভালোবেসে যাই,

ভালো থেকে যাই, ভালো রেখে যাই।

তোমার আমার সম্পর্ক এই ভালোবাসা

বিহীন মরুভূমিতে মরুদ্যানের জন্ম দিয়েছে।

যতদিন বাঁচবো এই মরুদ্যানকেই সত্যি প্রমাণ করে যাবো।

তুমি আমায় ভালোবাসা দিও, আমি তা জনমানসে বিলিয়ে দেবো…!!

বৈপরীত্য-অরুণ বর্মন

বছর ঘুরে এলো আবার রোজা দ্বীনের ঘরে

সিয়াম সাওম নিরাসক্তি ত্যাগের দীক্ষা তরে।

রাখতে রোজা মুমিনগণে হুকুম দিলেন তিনি

ইবাদত আর বন্দেগী সব করতে রাত্রি দিনই।

মুমিনগণে বসে কোণে আল্লাহ্ মালিক খোঁজা।

দ্বীনভাবেতে দীনের দয়া করতে পালন রোজা।

সেভাব কোথায় যাচ্ছে উবে আধুনিকের ছোঁয়ে

রোজা আসতেই ব্যস্ত আগাম ঈদের ফুর্তির মোহে।

রোজার চেয়ে ঈদের তরে হচ্ছে হারাম ঘুমে

বাজারঘাটে ঠাসাঠাসি কেনাকাটার ধুমে।

ব্যবসায়িরাও হালাল ভুলে হারাম পথে কামায়

যে যার মতো নিচ্ছে লুটে কে কার হারাম থামায়।

খোদা এখন ঘর ছেড়ে ঐ বাজারময়ে ঘোরে

সংযমীভাব যাচ্ছে দূরে বাজার করার জোরে।

নামাজ রোজার আত্মিক দর্শণ ভুলছে মুমিনগণে

হাজার নেকি নষ্ট করে ছুটছে মোহের সনে।

শঙ্খ-রনি নাগ মুন্না

 দোকানে আসিফ ভাই আসলো মোবাইলে কথা বলতে বলতে কিছুক্ষন কথা বলার পর ! পরে কথা বলব বলে কেটে দিল মোবাইল। আসিফ ভাই জিজ্ঞেস করল আমাকে।

-কেমন চলছে দিন কাল ভাই?

আমি    -ভালো। কার সাথে কথা বললেন?

আসিফ -বান্ধবীর সাথে।

আমি    -ভালোই সময় যাচ্ছে আপনার।

আসিফ -আপনার ভালো কাটছে না?

আমি    -না ভাই, ভালো লাগে না।

আসিফ -লাবণ্য নামে ওর একটা মিষ্টি বান্ধবী আছে, সুন্দর কথা বলে।ওর সাথে কথা বলেন।ভালো লাগবে।

আমি  -না ,লাগবে না।

আসিফ-দাঁড়ান বান্ধবীকে ফোন করে লাবণ্যর নাম্বার নিয়ে দিচ্ছি।

মোবাইল নাম্বারটি নিয়ে একটা ছোট কাগজে লিখে আমার টেবিলে রেখে চলে গেল। আর বলল এ নাম্বারে ফোন করে কথা বলেন। আমি কাগজটা টেবিলের ডেক্সে রেখে দিলাম। কিছুদিন পর আবার আসলো আসিফ কথা হয়েছে লাবণ্যর সাথে ? আমি বললাম না। কথা বলে দেখেন। ভালো লাগলে কথা বলবেন। এটা বলে এই বিষয়ে আর কথা হয়নি। আমরা দু,জন বাহিরে গিয়ে কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে চা,হালকা নাস্তা করে চলে গেল আসিফ আমি দোকানে চলে আসলাম।এর কয়েক দিন পরে বিকালে একা দোকানে বসে আছি।চিন্তা করলাম টেবিলের ডেক্সটা পরিস্কার করে ফেলি। তখন হাতে পরল লাবণ্যর মোবাইল নাম্বার লেখা কাগজটি।কাগজ থেকে মোবাইলে নাম্বারটি উঠিয়ে ফোন দিলাম লাবণ্যকে। কয়েকবার রিং পরল কেউ রিসিভ করল না। আবার কিছুদিন পর বিকালে ফোন দিলাম লাবণ্যর নাম্বারে। রিং দু,বার পরার পর রিসিভ করল লাবণ্য। আমার পরিচয় জানার পর কাজ আছে বলে কেটে দিল ।পরদিন বিকালে আবার তার কাছে ফোন করলাম। একটু কথা বলার পর তার মা আসল কেটে দিল ফোন। তার সাথে কথা বলার আগ্রহ যেন বেড়েই গেল। পরদিন সকালে ফোন করলাম কথা বলে তার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। জানতে পারলাম-  তারা এক ভাই এক বোন। সে বড় ,দ্বাদশ শ্রেনিতে পড়ে, ভাই পঞ্চম শ্রেনিতে। বাবা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হিসাবে কর্মরত আছে।মা গৃহিনী। প্রায় দিন সময় পেলে তার সাথে কথা বলতাম। ফোনে আমাদের আড্ডা বেশ জমে উঠল।এক সময় সে আমার সাথে একদিন কথা না বললে ঘুম হত না।পাগলের মত হয়ে যেত।লাবণ্য তার মোবাইল নরমাল হওয়ার কারনে একে অন্যর ছবি দেখার সুযোগ হয়নি।তবুও যেন ভালোবাসার কমতি ছিল না।প্রত্যেক দিন সকালে ওর ফোন পেয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গে । তার জন্মদিনে ওর বাবা জামা কিনার জন্য পনের শত টাকা দিয়েছে।ঐখান থেকে একশত টাকা আমার মোবাইল নাম্বার এ রিচার্জ করে দিয়ে ছিল।এভাবে ভালোবাসা দিন দিন বেড়ে চলেছে।একদিন সন্ধ্যায় লাবণ্য ফোন করল আমাকে কথা বলতে বলতে হঠাৎ ওকে দুষ্টামি করে বললাম তুমি হিন্দু ?ও চুপ হয়ে গেল।কিছুক্ষন পর বলল সন্দেহ হয়?শুন আমার মা শঙ্খ বাজাচ্ছে।এর পর বিশ্বাস করানোর জন্য প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায় তার মায়ের শঙ্খ বাজানো শোনাত।

দ্বিতীয় মৃত্যু প্রথম যৌবনে–আহমদ রাজু

শিখা আবারও আজ আত্মহত্যা করবে তা বাড়ির সবাই বুঝতে পেরেছিল হয়তো। সবাই বলতে তার বাবা-মা আর বড় ভাই সোহেল। কেউ বাঁচাবার প্রয়োজন বোধ করেনি সেসময়। তার অবশ্য কারণও ছিল। কারণ যতই থাকুক, যদি তাকে চরম সত্যর পথ থেকে ফেরাতো তাহলে আজ বাড়ির সবাইকে এমন নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো না। অন্তত আর দশটা পরিবারের মতো বসবাস করতে পারতো এই সমাজে।

সবেমাত্র ক্লাস নাইনে উঠেছে শিখা। নমিতার বড় ভাই পরেশের সাথে সেই ক্লাস সেভেন থেকে মন দেওয়া নেওয়া চলছিল তার। মাস তিনেক আগে কথাটা জেনে খালেকুজ্জামান অফিস থেকে রাতে বাড়িতে এসে মেয়েকে শাসায়। পরেশের সাথে মিশতে নিষেধ করে। বাবার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছিল শিখার। এর আগে কোনদিন বাবার মুখোমুখি হয়নি সে। খালেকুজ্জামান মেয়ের এমন অবনতি দেখে গালে চড় বসিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘যদি আর ওদিকে পা বাড়িয়েছিস তাহলে কপালে দুঃখ আছে।’ কী দুঃখ আছে তা স্পষ্ট করে না বললেও শিখা বুঝে ফেলেছিল কী আছে শেষে। চৌদ্দ বছরের জীবনের ওই প্রথম বাবা তার গায়ে হাত তুলেছিল। বাবার ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা হয় শিখার। সামান্য ব্যাপার নিয়ে গায়ে হাত তুললো! মনে মনে ভাবে এ পৃথিবীতে তার আর বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। সে সবার অজান্তে ঘরে থাকা নয়টি ঘুমের ট্যাবলেট গিলে খেয়েছিল। সবাই ভেবেছিল মারাই গেছে। মন বোঝানোর জন্যে হাসপাতালে নেওয়া হলে অলৌকিকভাবে সেরে ওঠে সে যাত্রায়। কিছুদিন পর বাবার কথা উপেক্ষা করে সে পরেশের সাথে দেখা করে- ঘুরে বেড়ায়। এক কান দু’কান থেকে শুরু করে পাঁচ কান পর্যন্ত পৌঁছে যায় সে কথা। 

সড়ক ও জনপথ বিভাগে চাকুরীর সুবাদে নয়নগঞ্জ ষ্টেশন বাজারের পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে থাকে খালেকুজ্জামান। বাড়ি তিন কিলোমিটার দূর হলেও সেখানে থাকার প্রয়োজন বোধ করেনি কোনদিন। কর্মস্থলের পাশে যখন থাকার বন্দোবস্ত তখন গ্রামের বাড়ি থেকে কষ্ট করে আসার-যাওয়ার কোন মানেই হয় না তা ভাল করে জানে। তাছাড়া ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার জন্যে এখানকার চেয়ে ভাল জায়গা আর নেই। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, হঠাৎ মেয়েটার কারণে তিলে তিলে অর্জন করা মান সম্মান এক নিমেষে ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। পাড়ার মানুষের মুখে মুখে তার মেয়ের কথা। সন্ধ্যায় ষ্টেনের পাশ দিয়ে বাড়িতে যাবার সময় সিংহগাতি গ্রামের কাশেম মাতব্বর খালেকুজ্জামানকে থামিয়ে পান চিবোতে চিবোতে বলে, ‘সমাজে আমরা ছেলে মেয়ে নিয়ে বসবাস করি। একটা পরিবারের জন্যে সমাজ দূষিত করতে দেবো না।’ খালেকুজ্জামান বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, ‘আমি ঠিক বুঝলাম না ভাই?’

‘না বোঝার কিছু নেই। তোমাকে আগেওতো সাবধান করা হয়েছে।’

‘কী হয়েছে ভাই যদি খুলে বলতেন?’ বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করে খালেকুজ্জামান।

‘তোমার মেয়ে যে এলাকায় এক হিন্দু ছেলের সাথে লীলা কীত্তন করে বেড়াচ্ছে সে খবর রাখো?’

‘কেন, শিখাতো আর ওই বদমায়েশ ছেলেটার সাথে মিশছে না। আমি তাকে খুব করে শাসিয়েছি। অভিমানে মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আপনিতো সবই জানেন।’

কাশেম মাতব্বর বাম দিকে ঝুকে ফিক করে পানের পিক ফেলে বলে, ‘জানলে কি হবে; তারাতো দিব্বি আবারো মজা করে বেড়াচ্ছে। তুমরা বাপু এখান থেকে বিদায় হও। আমাদের ভদ্রভাবে বসবাস করতে দাও।’

খালেকুজ্জামান লোকটার কথায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না। সে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

কিছুক্ষণ আগে দিনের ক্লান্ত সূর্যটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। অন্ধকারের চাঁদরে মুড়তে শুরু করেছে সমস্ত পৃথিবী। শিখা বারান্দার দক্ষিণ কোনায় মাটিতে মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসেছে। বাবাকে ঘরে ঢুকতে দেখে তার মনে খটকা লাগে। বাবার মুখে বিষাদের ছায়া তার চোখ এড়ায় না। খালেকুজ্জামান ঘরে ঢুকে মেয়েকে ডাক দেয়। বাবার ডাক শুনে শিখা ভয়ে ভয়ে ঘরের ভেতরে যায়। ঘরে তার মা আগেই বসা ছিল। বাবার গলা শুনে সোহেলও এগিয়ে যায়।

‘আমাদের একটু শান্তিতে থাকতে দিবি নাকি?’ কোন বিশেষণ না দিয়ে শিখার উদ্দেশ্যে কথাটি বলল খালেকুজ্জামান।

শিখা কোন কথা বলে না। সে যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।

সোহেল বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আবার কী হলো বাবা?’

‘কী হয়নি তাই বল? এলাকায়তো মুখ দেখাবার জো নেই? আসার পথে মাতব্বর শাসালো আমরা যেন এলাকা ছেড়ে চলে যাই।’

জরিনা বানু স্বামীর উদ্দেশ্যে বলল, ‘আগে কি হয়েছে বলবে তো?’

‘তোমার মেয়েটাকে শত নিষেধ করা সত্ত্বেও সেই হিন্দু ছেলেটার সাথে মেলামেশা করে। যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়।’ কথাটি বলে কেঁদে ওঠে খালেকুজ্জামান। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘কী পাপ আমি করেছিলাম, এই বয়সে এসে লোকে আমার দিকে থুথু ফেলে।’

শিখা পাথরের মূর্তির মতো নিচের দিকে চোখ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না। জরিনা বানু খাটের ওপর বসা ছিল। সে স্বামীর চোখে জল দেখে নিজেকে সামলাতে পারে না। উঠে এসে মেয়ের গালে কয়েকটা চড় বসিয়ে দেয়। বলল, ‘মরতে পারিস না। নাকি তোর মরণও নেই? যদি জানতাম তুই আমাদের মান সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলবি তাহলে জন্মের পরেই লবন গালে দিয়ে মেরে ফেলতাম।’ কেঁদে ওঠে সে।

শাড়ীর আচঁল দিয়ে চোখ মোছে জরিনা বানু। সে স্বামীকে শান্ত্বনা দেয়। বলল, ‘ওমন মেয়ে আমাদের দরকার নেই। তুমি বাড়ি থেকে বের করে দাও। ভাববো আমাদের কোন মেয়ে নেই-ছিল না।’

সোহেল কোন কথা বলে না। সে বুঝতে পারে না কী করবে। তার ছোট বোন এমন করবে তা কখনও কল্পনাও করেনি। প্রথমবার যেদিন কথাটা জেনেছিল সেদিন ভেবেছিল ছোট মানুষ, ভুল করতেই পারে। আস্তে আস্তে শুধরে যাবে। কিন্তু আজ রাস্তায় বাবাকে অপমানিত হতে হয়েছে জেনে সে শিখাকে বলল, ‘এখনও সময় আছে নিজেকে শুধরে নে। তুই আমাদের সম্মান নিয়ে এভাবে খেলা করিস না।’

সোহেলের কথায় উত্তেজিত হয়ে ওঠে খালেকুজ্জামান। বলল, ‘কিসের শুধরানো? এ বাড়ি থেকে এখনি বিদায় কর ওকে। হয় ও বাড়ি থাকবে না হয় আমি। যদি ও এই বাড়িতে থাকে তাহলে আমিই নিজেকে শেষ করে ফেলবো।’

শিখার দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। সে এক দৌঁড়ে নিজের রুমের ভেতর যেয়ে দরজার সিটকিনি আটকে দেয়।

বাবা-মা একটু শান্ত হলে সোহেল শিখার রুমের কাছে যেয়ে দেখে দরজা বন্ধ। সে শিখাকে ডাক দেয়। একবার-দুইবার-অনেকবার, দরজা ধাক্কায়। না কোন উত্তর আসে না। তার মনে ভয়ের সঞ্চার হয়- কোন কিছু হলো নাতো? সে ঘরের পেছনে যেয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে মেঝেতে শিখা পড়ে আছে। অজানা আশঙ্কায় ভয়ে চিৎকার করে ওঠে সে। তার চিৎকারে সবাই ছুটে এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখে মেঝেতে শিখার নিথর দেহ। পাশে ক’দিন আগে বাড়ির আঙিনায় লাগানো সীম গাছে দেবার জন্যে আনা কীটনাশকের খালি শিশি। একটা চিরকুট পাওয়া যায় পাশে। তাতে শুধুমাত্র লেখা, ‘পরজনমে আমাদের মিলন হবে। ইতি- তোমার বউ।’ পুলিশ আসে; লাশ নিয়ে যায় পোস্টমর্টেম করতে।

শহর থেকে মাটিতোড়া গ্রামে যখন লাশ এসে পৌঁছায় তখন বিকাল তিনটা। গ্রামে লাশ আনা হচ্ছে জেনে আগেই মসজিদের ঈমাম মাওলানা জুলমত খা ফতোয়া দিয়েছে, ‘কোনভাবেই ঐ মুরতাদের লাশ এই গ্রামের গোরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না। আত্মহত্যা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করেছে সেও জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ঐভাবে নিজ হাতে বিষপান করতে থাকবে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমরা নিজেরা নিজেকে হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়ালু। তারপরও যে আত্মহত্যা করল সে সীমা লঙ্ঘন ও জুলুম করল, অচিরেই আমি তাকে জাহান্নামের আগুনে পৌঁছে দেবো।’’ মাওলানা জুলমত খা হাতে থাকা পানটা মুখে পুরে দিয়ে আবারো বলে ওঠে, ‘যে কারণে কোনভাবেই ঐ কাফেরের লাশ এ গ্রামে দাফন করতে দেওয়া উচিৎ নয়।’ তার কথায় সম্মতি দেয় মাতব্বর আলহাজ্ব খালেক ধাবক। গ্রামের মেম্বরও সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।

নয়নগঞ্জ ষ্টেশন বাজারের পাশে সিংহগাতী কবরস্থানে দাফন করার কথা খালেকুজ্জামানের মাথায় একবারও আসেনি। নিজ গ্রামে কবরস্থান থাকতে অন্য জায়গার কথা ভাববেই বা কেন? কিন্তু নিজের এলাকার যে অবস্থা তাতে সেখানে কবর দেবার কথা নতুন করে ভাবতে হচ্ছে তাকে। শিখার বড় ভাই সোহেল মসজিদের ঈমাম থেকে শুরু করে গ্রামের মাথাধরা সবার কাছে যেয়ে হাত জোড় করেছে- পায়ে পর্যন্ত ধরেছে। কাজ হয়নি। তারা কোনভাবেই গ্রামের মাটিকে অপবিত্র করতে দেবে না!

মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় খালেকুজ্জামান চোখে অন্ধকার দেখে। সামনের সময়টা কিভাবে পার হবে তা সে বুঝতে পারে না। চিন্তা করার সমস্ত শক্তি ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছে। জরিনা বানু মেয়ের অভিমানী মুখ দেখে সেই যে জ্ঞান হারিয়েছে এখনও জ্ঞান ফেরেনি বলা চলে। দু’তিন ঘন্টা পরপর যা একটু চোখ মেলছে পরক্ষণে আবারো জ্ঞান হারাচ্ছে। একমাত্র বোনকে হারানো ভাই সোহেলও ভেঙে পড়েছে রাই শরিষার মতো। বোনটার ন্যায্য অধিকার সাড়ে তিন হাত মাটির বন্দোবস্ত করার জন্যে সে সারাদিন কম চেষ্টা করেনি।

 শোকার্ত পরিবারের পাশে কেউ এসে দাঁড়ায় না। এলাকার কেউ না-বাইরের কেউ না। যেন বড় কোন অপরাধ করে ফেলেছে। বাড়িতে ভীড় করা যে লোকগুলো আছে তারা শুধুমাত্র দেখতে এসেছে এর পরে কী হয় এ জাতীয় কিছু। কিংবা তারা সর্বোচ্চ একটু হা-হুতাশ করতে পারে, চোখের জল ফেলতে পারে। তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না গ্রামের কবরস্থানে কবর দিয়ে শিখার অতৃপ্ত আত্মাটাকে তৃপ্ত করার। সমাজের বাইরে যাবার ক্ষমতা তাদের কারো নেই। যারাই এ সমাজের বিরুদ্ধে কথা বলবে তাদের শিখার পরিবারের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে যেকোন ভাবে।

উপায় না পেয়ে খালেকুজ্জামান গভীর রাতে মেয়ের লাশ নিয়ে নয়নগঞ্জ ষ্টেশন বাজারের সরকারী কোয়াটারে ফিরে আসে। লাশ নিয়ে আসার কথা জানতে পেরে এলাকার লোকজন আগেই কোয়াটারের সামনে এসে ভীড় করে। মাতব্বররা সিংহগাতী কবরস্থানে কোনভাবেই অপমৃতের লাশ দাফন করতে দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। ভ্যানগাড়ি থেকে শিখার লাশ বারান্দায় রেখে বাবা ছেলে মিলে তাদের হাতে পায়ে ধরে। কোন কিছুতে মন গলে না। মুন্সি গিয়াস উদ্দিন আঙ্গুল উঁচিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে, ‘আমাদের এ গ্রাম অত্যন্ত পবিত্র। এখানে কোন শয়তানের স্থান নেই। আত্মহত্যা করা ইসলামী শরী’আতে একটি জঘন্যতম পাপ যার একমাত্র শাস্তি হল জাহান্নাম। বিশ্ব নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আত্মহত্যাকারীর জানাযা ছালাত আদায় করেননি। এ থেকে অনুমান করা যায় সে কত বড় পাপী। আত্মহত্যা ইহকাল পরকাল উভয়-ই ধ্বংস করে দেয়।’ মুন্সি গিয়াস উদ্দিনের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ কথা বলে না।

ইতিমধ্যে একদিন দুই রাত পার হয়েছে। এখানকার অবস্থা মাটিতোড়ার মতো দেখে হতাশায় মাথা ঘুরে ওঠে খালেকুজ্জামানের। সে মাটিতে বসে পড়ে। সোহেল বাবাকে ধরে বারান্দায় শুইয়ে দেয়। সে নিশ্চিত এখানকার লোকজন তার বোনকে দাফন করতে দেবে না। সে পাশের নেওয়ারগাছা গ্রামে কমিশনারের কাছে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। সোহেল শুনেছে এই কমিশনারের কারণে নাকি এলাকার আইন-শৃংঙ্খলার চরম অবনতি হচ্ছে। সে এলাকার ত্রাস। পর পর তিনবার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছে ক্ষমতার জোরে। সে নাকি মাদক ব্যবসায়ী- চোরাকারবারী, খুনী, বোমাবাজ আরো কত কী। তার মন বলে, যতই খারাপ হোক, সেতো মানুষ। হয়তো কোন একটা ব্যবস্থা সে করবেই। তাছাড়া যত দেরি হচ্ছে ততই লাশের অবস্থা বেগতিক হচ্ছে; গন্ধ ছুটতে শুরু করেছে। বাজার থেকে বরফ এনে দেওয়া হলেও তাতে খুব বেশি কাজ হয় না। সে ভোরে অন্ধকার থাকতে থাকতে রওনা দেয় নেওয়ারগাছা গ্রামের উদ্দেশ্যে।

সোহেল নেওয়ারগাছার কমিশনার গালকাটা রবিনের বাড়ি যখন উপস্থিত হয় তখন সকাল সাতটা। কমিশনারের কাছে সোহেল ভয়ে ভয়ে সব কথা খুলে বলে। সব কথা শোনার পর বলল, ‘কেউ যখন তাদের এলাকায় কবর দিতে দিচ্ছে না তখন আমার এলাকায় তোমার বোনের কবর দেবার ব্যবস্থা হবে। একটা মৃত মনুষের সাড়ে তিনহাত মাটি পাওয়া তার নাগরিক অধিকার। সে অধিকার আমরা খর্ব করতে পারি না। তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে সব ব্যবস্থা করো।’ কমিশনারের কথা শুনে তার সম্পর্কে সমস্ত ধারণা তার পাল্টে যায় সোহেলের। সে মনে মনে কামনা করে এমন কমিশনাররা-ই যেন ক্ষমতায় থাকে যুগ যুগ।

কবর দেওয়ার বন্দোবস্ত হওয়ায় সবাই যখন নেওয়ার গাছার উদ্দেশ্যে রওনা হয় তখন হঠাৎ এক পশলা অনাকাঙ্খিত বৃষ্টি এসে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা শিখার লাশটাকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।

তুমিই তো আমার পৃথিবী -বেলাল মাসুদ হায়দার

পার্কের বেন্চে নিবিড় হয়ে

পাশা পাশি বসে।

এক জোঁড়া বৃদ্ধ বৃদ্ধা ।

আবেগ জড়িত কন্ঠে বৃদ্ধা

বললো —- তোমাকে ভালবাসি।

শুনে বৃদ্ধ বলে—- আমিও বাসি।

প্রমান দিয়ে পৃথিবীকে চমকে

দাও দেখি ——- বৃদ্ধা বলে।

কানের কাছে মুখ নিয়ে,  ফিসফিস  করে

বৃদ্ধ ভাব আবেগে বলে—-

তোমাকেই তো ভালবাসি।

চমকে যেয়ে বৃদ্ধের হাত ধরে অবাক

হয়ে বৃদ্ধা বলে– চুপি চুপি বললে,

পৃথিবী জানবে কি ভাবে?

বৃদ্ধাকে বুকে জড়িয়ে মুগ্ধ চোঁখে

বললো বৃদ্ধ — তুমিই তো আমার পৃথিবী।

তুমি জানলেই হবে।

মাহে রমাদান-এম এ কাসেম অমিয়

এগারটি মাস পার করে আজ দুয়ারে রমাদান

সব ছেড়ে আল্লার রাহে করতে সিয়াম সাধন।

তাঁর ভয়ে করবো না পান এক ফোঁটাও জল!

দিবেন তিনি নিজ হাতে মোদের কষ্টের ফল।

রমজানের শিক্ষা নিতে হবে দীক্ষা অন্যায়-অবিচার করবো দুর;

ঝগড়া বিবাদ করবো নাকো গাইবো মানবতার সুর।

পরনিন্দা পরচর্চা হতে দুরে রইবো করবো না গীবত!

হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে যাবো মোরা অহংকার করবো রহিত।

ষড় রিপুর তাড়োনা থেকে করতে হবে সংযম সাধন,

লোভ-লালসা পরিহার করে করতে হবে চরিত্র গঠন।

তাকোয়ার আগুনে পুড়ে পুড়ে মোরা হয়ে যাবো খাঁটি মানুষ;

ক্ষণিকের দুনিয়ায় সবই মিছে সবই যেন ফানুস!

সমাজে যত ভুখা-নাঙ্গা আছে, আছে যত গরীব-দুঃখী;

যাকাত-ফেতরা,মানত-ছদকা করবো দান করবো সুখী।

ধনী-গরীব ভেদাভেদ ভুলে চলবো সবে সমানে সমান।

ইসলামের শিক্ষা বিলাবো মোরা গাইবো সাম্যের গান।

রমাদান শেষে ঈদের মাঠে এক সাথে সবে জুটি!

হাসি আর খুশি বিলাবো মোরা দু’হাতে মুঠি মুঠি।।

চাঁদের হাসি-শহিদুজ্জামান মিলন

আকাশ জুড়ে ফুটলো যখন,

মিষ্টি চাঁদের হাসি।

উঠলো জেগে কুসুম কলি,

বাজলো ইদের বাঁশি।

খুশির বার্তা নেমে এলো,

চাঁদের সাথে সাথে।

মানুষ তখন ভেদাভেদ ভুলে,

আনন্দতে মাতে।

খুশির পাখি উঠলো গেয়ে,

প্রাণ জুড়ানো গান।

গাছে গাছে ছড়িয়ে গেল,

সুরের ঐক্যতান।

সকালের মেঘ-জাহিরুল মিলন

সকাল ভর্তি পরিক্ষা দিতে ঢাকায় যাবে। এবার সে এইচ এস সি পরীক্ষায় পাশ করেছে। তিন বিষয়ে লেটারসহ স্টার মার্কস নিয়ে কৃতিত্বের সাথে সে পাশ করেছে। উজ্জ্বল করেছে বিদ্যালয় ও পরিবারের মুখ। তাড়াতাড়ি গোজগাজ করে বেরিয়ে পড়তে হবে তা না হলে দেরি হয়ে যাবে। বাস আসবে বিকালে ৫ টাই তাই সব গুছিয়ে রাখতে হবে এখনি। একটা ছোট বাক্সে তার সকল প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র গচ্ছিত ছিল। বাক্স খুলে সব কাগজ-পত্র বের করে দেখছে কোনটা লাগবে আর কোনটা লাগবেনা। কাগজে কাগজে সমস্ত ঘর একাকার করে ফেললো। হঠাৎ তার চোখ একটি বইয়ের উপর গিয়ে থমকে গেল। বইটি প্রখ্যাত উপন্যাসিক জাহিরুল মিলনের লেখা “পৃথিবীর আলো”। বইটির মলাটে ধূলা লেগে কিছুটা মলিন দেখালেও কি যেন এক অজানা ভালোলাগা মিশে আছে তার উপর। সকাল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মোচড় দিয়ে উঠল বুকের বাম পাশ। আকষ্মিক দু’গন্ড বেয়ে কয়েক ফোঁটা মুক্তার দানার মত অশ্রু বইটির উপর পড়ল। ডুকরে কেঁদে উঠল অবুঝ মন। পাশেই সেই রক্ত আর অশ্রু মাখা টি-শার্ট। নিজেকে আর সামলাতে পারলোনা টি-শার্টটি নিয়ে রক্তে ভেজা স্থানটা বারবার দেখতে দেখতে চুমু খেতে আর কাঁদতে লাগল। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে বইটি স্বস্নেহে নিজের হাতে তুলে নিয়ে শার্টের এক কোনা দিয়ে আলতো করে মুছে একটা চুমু খেয়ে জড়িয়ে নিল বুকে। হৃদয় ভেঙ্গে যেতে লাগল চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোখ মুছে বইটি মেলে চোখের সামনে। ভেসে উঠল সেই পুরাতন স্মৃতি।

সালটা ছিল ২০০০। আগষ্টের মাঝামাঝি। সকাল এসএসসি পাশ করে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাড়ি শহর থেকে অনেক দূরে তাই হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতে হয়। কলেজের প্রথমদিনে চোখে পড়ে এক অপরুপ সুন্দরী। দেখতে পরমা সুন্দরী গল্পে যাকে বলে পরীর মত। সকাল এমনিতে একটু লাজুক প্রকৃতির সহজে কোন মেয়ের সাথে কথা বলেনা। কিন্তু মেয়েটিকে দেখার পর তার খুব ভাল লাগল। কথা বলতে ইচ্ছে করল কিন্তু সাহসে পারল না। কিছুদিনের মধ্যে তার কয়েকজন বন্ধু হয়ে গেল। একসাথে চলতে চলতে সবার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেল সে।

একদিন ক্লাস করে বন্ধুদের সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসে বসার জন্য সকলে একটা জায়গা খুঁজছিল। হঠাৎ একটা নারী কণ্ঠ শুনতে পেল সকাল।

“এই মুর্তজা কোথায় যাচ্ছিস? এখানে আয়”।

সকাল তাকিয়ে দেখে সেই মেয়েটি।

সে জিজ্ঞাসা করে –“কে রে ও? তুই ওকে চিনিস?”

মুর্তজা বলে- “ও! ওর সাথে তোর পরিচয় হয়নি? ও আমাদের বন্ধু মেঘ। আমরা একই বিদ্যালয়ে পড়েছি। খুবই ভালো মেয়ে”।

-আসছি।

কথা বলতে বলতে মুর্তজা উত্তর দিল। তারপর সকালকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যায় সেদিকে। সকাল যেতে চাচ্ছিলনা। মুর্তজা একরকম জোর করে তাকে সেখানে ধরে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে মুর্তজা তাকে তাদের আসরে বসিয়ে দিয়ে পাশে বসে পরিচয় করিয়ে দিল।

“আমাদের বন্ধু সকাল”।

“সকাল! খুব সুন্দর নামতো!”

মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল। সকাল লজ্জায় তখনো মাথা তোলেনি। যেন সে মস্তবড় অপরাধ করেছে। মেয়েটি তাকে জিজ্ঞাসা করল-

“তুমি মাথা নিচু করে আছো কেন?”

সকাল কোন কথা বলেনা।

“আমি মেঘ, জাহিরা মেহজাবিন মেঘ”। বলে মেয়েটি সকালের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। সকাল কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা।

“এই সকাল কি করছিস ? লজ্জা পাচ্ছিস কেন? এরা সবাই আমার বন্ধু”।মুর্তজা কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলল।

সকাল এবার তার কাঁপাকাঁপা হাতটি মেঘের দিকে বাড়িয়ে তার হাতের সাথে মিলায়ে বলল

“আমি সকাল, জাহিন শাহরিয়ার সকাল”।

এবার সকাল মেঘের দিকে ভাল করে তাকালো। সেদিন দূর থেকে দেখেছিল। ভাল করে দেখা হয়নি। আসলেই সে পরমা সুন্দরী। টানা টানা চোখ, গোলাপের পাপড়ির মত দু’ঠোট, ভ্রমর কালো একগুচ্ছ চুল নেমে গেছে নিতম্ব পর্যন্ত। সে এক অনন্যা সুন্দরী যাকে প্রথম দর্শনে যে কেউ ভালবেসে ফেলবে।

“আমাদের দেখে লজ্জা পাবার কিছু নেই আমরা তোমার বন্ধু”।

হঠাৎ সে মেঘের কথায় সম্বিৎ ফিরে পেল। শুধু মাথা নেড়ে সে সম্মতি জানালো। তাদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হল তারপর যে যার বাড়ির দিকে রওনা দিল।

দিনের পর দিন পার হয়ে যায়। সকাল ও মেঘের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ট হতে লাগলো। তারা বন্ধুর মত তুমি থেকে তুইতে পৌছাল। সকাল ও মেঘ যেন একদিন দুজন দুজনকে না দেখে থাকতেই পারেনা। তাই প্রতিদিন তাদের কলেজে আসতেই হবে। সকাল অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। সে এখন কথা না বলে থাকতেই পারেনা। সেই এখন সকলের চেয়ে বেশি কথা বলে। বন্ধুদের আসরটা সেই নানান গল্পে মজিয়ে রাখে। মনে মনে সে মেঘ কে অনেক ভালোবাসে। মেঘও যে সকাল কে ভালোবাসেনা তা নয়। তার ও মনের কোনে সকালের জন্য একটা অধিকারের স্থান দিয়ে রেখেছে।

সকাল ও মেঘ দুজন দুজনার অনেক কাছাকাছি এলেও কেউই তাদের মনের ভাল লাগার কথা প্রকাশ করতে পারেনি। আসলে সাহসই হয়নি ওদের। ওদের দুজনারই ভাবনা যদি দুজনার মধ্যে এই নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়। কেউ যদি এই সম্পর্ক মেনে না নেয় তাহলে বন্ধুত্ব নষ্ট হবে এই ভয়ে কেউই সামনে এগুতে চাইনা। বন্ধু-বান্ধব সকলে জানে যে দুজন দুজনকে ভালোবাসে। শুধু ওরা দুজন জানেনা যে তাদের বন্ধুরা সকলে ওদের মনের কথা জানে।

“আজ ক্লাস শেষে লাইব্রেরীতে দেখা করবি“। সকাল মেঘ কে কলেজে গিয়ে বলে।

কেন?

“কথা আছে”।

“এখন বল”।

“লাইব্রেরীতে আয় তারপর শুনিস”।

সকাল মাথা নেড়ে হ্যা-সূচক ইঙ্গিত করল।

তারপর একটা মুচকি হেসে মেঘ ক্লাসে চলে গেল। সকালও ক্লাসে চলে গেল।

ক্লাস শেষে সকাল ও মেঘ যথাসময়ে লাইব্রেরীতে এসে হাজির হল। তারপর একটা নিরিবিরি জায়গা দেখে সামনাসামনি বসে পড়ল।

“কি হয়েছে রে পাগলা? মেঘ জিজ্ঞাসা করল।

সকাল একটু আমতা আমতা করে-

“মেঘ কি করে যে কথাটা বলব বুঝতে পারছিনা। তুই আবার কি ভাববি এই চিন্তা করছি”।

“আর ভনিতা করতে হবেনা। তোর আবার লজ্জা!” বিদ্রুপের সুরে মেঘ বলল।

“না মানে। একটা কথা বলব রাখবি?”

“আর মানে মানে করতে হবেনা। যা বলার চট করে বলে ফেল। তুই একটা বলবি আর আমি রাখবোনা! তাই কি হয়?”

“সত্যি! আমার কথা রাখবি?”

“আরে ঠিক আছে, রাখবো। এবার কি বলবি না আমি চলে যাব?”

“আসলে সত্যি কথা বলতে কি, একটু থেমে যায় সকাল।

“আবারও? আমি গেলাম”।

বলে উঠতে যাবে এমন সময় সকাল তার হাত চেপে ধরে। মেঘ পিছন ফিরে তাকাতেই

“আমি তোকে খুব ভালবাসি”। বলে মুখ নিচু করে সকাল।

“কি! কি বললি তুই! আবার বল”। কিন্তু সকাল মাথা নিচু করে বোবার মত বসে থাকে। আর মেঘ মিটমিট করে হাঁসতে থাকে। তারপর সকালের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তার চিবুক হাত দিয়ে তুলে ধরে বলে

“ওলে বাবালে খোকা লজ্জা পেয়েছে। এই আমার দিকে তাকা। তাকা বলছি”। সকাল এবার মেঘের দিকে তাকায়। কিন্তু কিছু বলেনা।

“আমিও তোকে ভালবাসি”।

একথা শোনার পর সকাল তার নিজের কান কেও বিশ্বাস করতে পারছিলনা। আবেগে মেঘ কে জড়িয়ে ধরে বলল

“সত্যি তুই আমাকে ভালবাসিস?

হ্যাঁ, সত্যি, সত্যি, সত্যি। আমি শুধু ভয়ে তোকে বলতে পারিনি”।

“ওরে ফাজিল নিজের কথা আমার কাছ থেকে আগে জেনে নিলি?”

“বেশ করেছি , ঠিক করেছি। তোর মনের কথা আগে জেনে নিয়েছি”।

“আমরা আগে থেকে জানি”। হঠাত এমন কথা শুনে দুজনে যেন ভুত দেখার মত ভয় পেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে তার বন্ধুরা মিটমিট করে হাঁসছে।

“এখানে বসে ভালবাসার রঙ্গলীলা হচ্ছে তাইনা? মুর্তজা বলে তেড়ে আসে। -আমরা সব শুনেছি।

এগুলো শুনে দুজনেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। যেন পালাতে পারলেই বাঁচে।

তারপর থেকে দুজনার পথ এক হয়ে গেল। কলেজ ক্যাম্পাসে কেউ আসুক বা না আসুক এই প্রেমিক যুগলকে অবশ্যই দেখা যাবে। কলেজের সবাই জানত সকাল আর মেঘ একে অপরকে কতটুকু ভালবাসে। তারা দুজন দুজনকে এমন ভালবাসত যে কেউ তাদের সম্পর্কে খারাপ বললেও তারা বিশ্বাস করত না। অনেকে চেষ্টা করেছে তাদের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরাতে কিন্তু তারা তাদের কথায় কোন পাত্তায় দিত না। তাই এখন আর কেউ তাদেরকে ঝামেলা করেনা। বরং যদি পারে সাহায্য করে। তারা বুঝে গেছে এদের ভালবাসা এত মজবুত যে কেউ তা ভাঙতে পারবেনা।

ক্লাস শেষে বাড়ি যাবার সময় মেঘ সকালকে ডেকে বলল

“আগামীকাল একটু সকালে কলেজে আসিসতো।

“কেন?

“আয় তারপর বলবো। আর শোন আগামীকাল থেকে আর তুই নয় তুমি করে কথা বলবো দুজনে। মনে থাকবে?

“আচ্ছা ঠিক আছে। বলে হাঁসতে হাঁসতে দুজনা বাড়ির পথ ধরল।

মেঘের বাড়ি কলেজ থেকে বেশি দূরে নয়। মুর্তজা ও সকালদের মেস থেকে সামান্য একটু দূরে। পায়ে হেঁটে গেলে পাঁচ মিনিটের পথ। সকাল ও মুর্তজা একই মেসে থাকে। প্রথমে মুর্তজা থাকত পরে সকালের সাথে বন্ধু সম্পর্ক হবার পর তাকে কাছে এনে রেখেছে। দুজনে একে অন্যের জন্য অন্তপ্রাণ। মুর্তজার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের একটি ছোট্ট গ্রামে। সে সেখান থেকে এসে মেঘের সাথেই একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে। তাই তারা খুবই ভাল বন্ধু সেই থেকে।

সকাল পরেরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসলো কিন্তু পড়ায় মন বসাতে পারল না। শুধু বারবার কলেজে যাবার জন্য মনটা ব্যকুল হয়ে উঠতে লাগল। উঠে নাস্তা সেরে কলেজে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগল। মুর্তজা তখনো ঘুমাচ্ছিল তাই তাকে আর না ডেকে একা একা কলেজে যাবার উদেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। পায়ে হেঁটে সে কলেজে এসে পৌঁছাল। তখনো কেউ কলেজে আসেনি। তবে কলেজের প্রধান ফটক খোলা রয়েছে। কলেজের ভিতর ঢুকেই সকাল চমকে উঠল। এত সকালে মেঘ কলেজে চলে এসেছে! আজ আর রক্ষে নেই। চুপিচুপি কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সকালকে দেখে মেঘ অভিমানে অন্যদিকে ফিরে দাঁড়াল। সকাল মেঘের আরো কাছে গিয়ে তার হাত ধরে বলল-

‘দেরি হয়ে গেছে সোনা।‘

‘দেরি হয়ে গেছে সোনা।‘ মুখ ভেংচে মেঘ সকালের কথার পুনরাবৃত্তি করল।

‘আমি সেই কখন থেকে উনার জন্য অপেক্ষা করছি আর উনি এখন এলেন।”

“ আচ্ছা ম্যাডাম ঠিক আছে আর কখনো দেরি হবেনা। এই কান ধরছি, নাক ধরছি”।

মূহুর্তে মেঘ সকালের হাত ধরে করুন স্বরে বলল

“সকাল তুমি হয়ত জান না আমার ধ্যান-জ্ঞান সবই তুমি। তুমি একটু চোখের আড়াল হলেই আমার ভয় হয় যদি তোমাকে আমার জীবন থেকে হারিয়ে ফেলি। তুমি হারিয়ে গেলে আমি আর বাঁচব না। কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে নাতো, কথা দাও”।

“ আচ্ছা কথা দিলাম তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও হারাবোনা। তুমি আমার প্রাণ আমি কেন তোমাকে ছেড়ে যাব বল”। সকাল মেঘকে জড়িয়ে ধরে বলল “ আমি সারাটা জীবন আমার এই বুকের মধ্যে তোমাকে আগলে রাখব। কোথাও হারিয়ে যাব না। মেঘ সকালের বুকে মাথা রেখে বলল “ আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না। আমি শুধু তোমার ,শুধুই তোমারি”। এই মনে আর কারও স্থান হবেনা। এই মনের একমাত্র দাবিদার তোমার, অধিকারও তোমার, আর কারও না।

সকাল মেঘের মুখটা দুহাতে আলতো করে ধরে বলল “ আমি জানি তুমি আমার আর অন্য কারো না, আমিও তেমনি তোমার অন্য কারো না। এবার বল তোমার কি কাজ আছে বলেছিলে?”

“ওহ! সে কথাতো ভুলেই গেছি”। ব্যাগে হাত দিয়ে একটা রেপিং করা কি যেন বের করল মনে হয় বই আর একটা শপিং ব্যাগ। তারপর সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল “ এটি আমার তোমাকে দেয়া “প্রথম উপহার”। তোমাকে দেবার মত অনেক কিছুই ছিল কিন্তু আজকের দিনটিকে স্বরনীয় করে রাখার জন্য আমার এই ছোট উপহার। আমার পছন্দের একটা বই আর তোমার পছন্দের সাদা রঙয়ের একটা টি-শার্ট। শুধু তোমার জন্য।  সকাল হাত বাড়িয়ে সেটা নিল এবং মেঘের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল “পাগলি একটা, এর জন্য এতকিছু!”।

এইচএসসি ১ম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার (ইয়ার ফাইনাল) দিন এগিয়ে আসছে। পরীক্ষার আর বেশিদিন নেই। সকলেই পড়ার টেবিলে দিন-রাত বই নিয়ে অধ্যায়নে ব্যস্ত। সকালেরও তাই পড়ার খুব চাপ। কলেজের ক্লাস আর শিক্ষকদের কাছে টিঊশনের পর দিন ফুরিয়ে যায়। রাত নেমে আসে তার প্রকান্ড বাহু মেলে। তেমনি সকালের চোখেও নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। ঘুমকে দূরে সরিয়ে বসতে হয় পড়ার টেবিলে। ভাল ফলাফলের জন্য শিক্ষার্থীদের কত কি যে করতে হয়। সকাল ভাবে আর এভাবেই পড়ে চলে প্রতিরাতে।

সকাল তার পড়ার টেবিলে কম্পিউটার সাজেশন খুঁজছে। কিন্তু তার টেবিলের কোথাও তার হদিস পেল না। অগত্য কি আর করা খুঁজতে খুজতেই মুর্তজাকে জিজ্ঞাসা করল “ এই মুর্তজা আমার কম্পিউটার সাজেশনটা কইরে, তুই নিয়েছিস?”

“ না, আমি নিইনি, তুই না সেদিন জাহিদকে দিলি। তোর মাথা গেছে। ডাক্তার দেখা।“

“ভুলতো মানুষেরই হয়, একটা কথা জিজ্ঞাসা করলাম শুনিয়ে দিল এত্ত কথা। বলে দুজনেই হাঁসিতে ফেটে পড়ল।

“ এই মুর্তজা শোন, আজ সন্ধ্যায় তাহলে জাহিদের মেসে গিয়ে সাজেশনটা নিয়ে আসব, কেমন?”

“আচ্ছা” বলে মুর্তজা সম্মতি জানালো।

সকাল আজ মেঘের দেয়া টি-শার্টটি পরেছে। উপহার দেয়ার পর একদিনও পরেনি আজই প্রথম পরল। এজন্য অবস্থা মুর্তজার টিপ্পুনি মার্কা হাসি সকালের চোখ এড়াইনি। মেঘদের বাসার দুই/ তিনটে বাসার আগে সকালের বন্ধু জাহিদের মেস। জাহিদের সাথে সেখানে সকালের বন্ধু রাজীব, কামাল এবং রাহাতও থাকে। সন্ধ্যায় মুর্তজাকে নিয়ে সকাল জাহিদের মেসে গিয়ে জাহিদকে বকাবকা শুরু করল। পরে জাহিদ তাকে অনেক অনুনয় করে ঠান্ডা করল। সাজেশন দিতে ভুলে গেছে তার জন্য জাহিদ ক্ষমা চেয়ে নিল। তারপর গল্পে গল্পে কেটে গেল অনেকক্ষণ। এবার উঠার পালা। কিন্তু হঠাত কান্না আর চেঁচামেচির আওয়াজ পেল তারা। সকাল সকলের উদ্দেশ্যে কি হয়েছে রে, কে কাঁদছে চলতো বাইরে গিয়ে দেখি।

সকালের সাথে সকলে “চল” বলে বাইরে বেরিয়ে আসল। চারিদিকে তাকিয়ে, কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কান্নার শব্দ কোথা থেকে আসছে।

জাহিদ বলল- “কান্না হয়ত মেঘদের বাড়ির ঐদিক থেকে আসছে। চলতো গিয়ে দেখি। কার কি হল”।

যেই বলা সেই সকলে মিলে চলল কান্নার শব্দ অনুসরণ করে। গিয়ে থামল মেঘের বাসার সামনে। কান্নার শব্দটা মেঘের বাসা থেকেই আসছিল। তারা দেখে অনেক লোকের ভীড়। বাসার ভিতরে প্রবেশ করল তারা সবাই। সাবার আগে সকাল ভিতরে প্রবেশ করেই একজনকে জিজ্ঞাসা করল-“এখানে কি হয়ছে? এরা কান্না করছে কেন?” এসময় একজন বলল-“ আমাদের মেঘকে সাপে কেটেছে”।

মেঘের নাম বলার সাথে সাথে সকালের মাথাটা ঘুরে গেল, মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। মুর্তজা সকালের পিঠে হাত দিতেই সকালের চোখ ছলছল করে উঠল। সকাল আর থাকতে পারলোনা মানুষের ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। গিয়ে দেখে একটা চৌকির উপর যন্ত্রনায় ছটফট করছে মেঘ। চারিদিকে ঘিরে আছে ওদের বাসার মহিলারা। পাশে একজন মহিলা কাঁদছে হয়ত ওর মা। কারণ এর আগে সকাল কখনও ওর মা কে দেখেনি। সকালকে দেখে মেঘ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সকালও থাকতে পারলোনা। তার চৌকির পাশে তার মাথার কাছে গিয়ে বসলো। জাপটে ধরলো মেঘের হাত। কিছুই বলতে পারলোনা শুধু দুজনে দুজনার দিকে চেয়ে কাঁদতে লাগলো। জলের বন্যা বয়ে যেতে লাগলো দুজনার চোখে।

সকাল শুধু বলল-“ কি করে হলো এসব?”

খুব কষ্টে মেঘ বলল-“ ঘরে বসে পড়ছিলাম হঠাত পায়ে সাপে কামড় দিল” বলতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল তার। এই কষ্ট অনুভব করে সকাল মেঘকে চুপ করে থাকতে বললো। আর মুর্তজাকে ডাক্তার আনতে বললো। মুর্তজা বেরিয়ে গেল।

খুব কষ্ট করে মেঘ বলতে লাগলো-

“ জীবনের শেষ বেলায় তোমাকে দেখে যেতে পারলাম এবার তোমার কোলে মাথা রেখে মরলেও আমার সুখ”।

সকাল মেঘের মুখে হাত রেখে চুপ করে থাকতে বলল।

মেঘ তাকে বাধা দিয়ে বললো-“ সকাল আমার সময় শেষ। আমাকে শেষবারের মত মনের কথাগুলো বলতে দাও”।

“তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? চুপ করো। তোমার কিছু হবেনা। আমি তোমাকে আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে দেবনা”।

“সকাল, পাগলামো করো না। বড় আশা ছিল সারাজীবন তোমার পাশে থাকবো। সে আশা আর পূরণ হলো না। আমি তোমার হতে পারলাম না। একদিন বলেছিলাম আমি শুধু তোমারি। আর কেউ এই মনের অধিকারী না। কিন্তু আজ সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। আমি আমার কথা রাখতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করো মনে রেখ না আর আমাকে”।

সকাল আর থাকতে পারলো না কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে উঠল “মেঘ, তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পার না। আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? তুমি ছাড়া আমি বড় একা”।

মেঘ সকালের হাত ধরে আছে। ক্রমশ তার কণ্ঠ নিস্তেজ হয়ে আসছে। কথা অস্পষ্ট হতে লাগলো। বিষে সমস্ত শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রনায় কাতরাতে লাগলো। তারপরও সকালের হাত খানা শক্ত করে ধরে সে বললো-“ সকাল আমার মাথাটা তোমার বুকের মধ্যে শক্ত করে ধরো”। সকাল মেঘের কথা মত তার মাথাটা আলতো করে বুকের মাঝে চেপে ধরলো। মেঘের আর কথা বলার শক্তি নেই। আস্তে আস্তে সে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে ফেনার সাথে রক্ত বের হতে লাগলো। সকাল তার টি-শার্ট দিয়ে তা বারবার মুছে দিতে লাগলো। আর কোন কথা নয় শুধু দুজনা দুজনার দিকে চেয়ে চোখে অশ্রুর শ্রাবন ধারা বইতে লাগলো। মেঘ এক দৃষ্টিতে সকালের দিকে চেয়ে রইল। তারপর খুব কষ্টে একটু হাসলো। সেই হাসি মাখা মুখের দিকে সকাল তাকিয়ে রইল। মেঘের চোখের কোনা বেয়ে জলের ধারা বয়ে যেতে লাগল। নিস্তেজ হয়ে গেল মেঘ। চারিদিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। সকাল বোবার মত মেঘের নিথর দেহটাকে বুকে জড়িয়ে বসে রইল। বইটা যত্ন করে ব্যাগের মধ্যে রাখলো আর টি-শার্টে লেগে থাকা মেঘের রক্তমাখা ভালবাসার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে তা ব্যাগের মধ্যে রেখে ব্যাগ গুছিয়ে নিল। তারপর ব্যাগ ঘাড়ে করে বাইরে বেরিয়ে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল। এবার এগিয়ে যাবার পালা তাই নিজের গন্তব্যে চলল সকাল। কত স্মৃতি, কত ভালবাসা, কত কষ্ট আর কত হাহাকার পিছন থেকে ডাক দিচ্ছে। সেদিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল সকাল পেছনে পড়ে রইল সব। 

ঈদের স্মৃতি-খাদিজা ইতু

ছোট্ট বেলার ইদের কথা খুব যে মনে পড়ে,

রাত থম্থম রাতের শেষে সকাল কখন হবে

মনের ভিতর ঈদের খুশির জোয়ার বয়ে যেত।

ঈদের খুশি ইদের আমেজ ইদের চাঁদ দেখে

ফিরনি সেমাই পায়েশ মিঠাই খাব বেশি ভেবে

ভোর না হতে ঘুম ভাঙ্গত ঈদের পোষাক পেতে

চান্নি রাতে বাবা মোদের পোষাক  আনত কিনে

নতুন পোষাক কিনে বাবা ফিরতো গভীর রাতে

পথের দিকে চেয়ে থেকে চোখ যে ঘুমে ঢোলে

একটি সময় ঘুমিয়ে যেতাম পথটি বাবার চেয়ে

সকাল  না হতেই  নতুন পোষাক সামনে নিয়ে বসে

দু” তিন ঘন্টা কাটিয়ে দিতাম নতুন পোশাক পেয়ে।

মা যে আমার গোসল সেরে রান্না ঘরে যেত

ফিরনি সেমাই জর্দ্দা পায়েশ রাধতো মজা করে।

নদীর ঘাটে গোসল করতাম হাবিব সাবান দিয়ে

গোসল সেরে নতুন জামা পরতাম আনন্দ করে।

বুবু  মোদের সাজিয়ে দিত স্নো পাঊডার আলতা লিপিষ্টক দিয়ে।

তারপরই যে মজার সময় আসতো সবার মাঝে

ঈদ সেলামি পাবার আশায় ফিরতাম দ্বারে দ্বারে

বড় ভাই আর দুলাভাইয়ের নতুন টাকা পেয়ে

নতুন টাকার গন্ধ নিয়ে  লাগতো দোলা মনে

ছুটতাম সবে ঈদের মেলায় হরেক জিনিস দেখা

পিয়াজু,পাপড় বাদাম কিনে মায়ের জন্য আনা

বাশি, খেলনা কিনতাম কত দু’ চার আনা দিয়ে

বন্ধু বান্ধব ঘুরতাম সবে নতুন পোশাক পরে।

ঘোরাঘুরি খেলাধুলায় দিনটি যেত চলে

কী যে মজাই কাটত মোদের ঈদের দিনটি ধরে

এমন মজা পাই না যে আর ছোট্ট বেলার মত।

মায়ের হাতের ফিরনি পায়েশ খাই না কতকাল

মা যে আমার হারিয়ে গেছে ফিরবে না যে আর

নতুন পোশাক পাবার আশায় থাকতে হয় না আর

বাবাও আমার হারিয়ে গেছে কিনবে না আর পোশাক

ছোট্ট বেলার ইদের মজা লাগবে না যে আর।