Home » করোনা বিষয়ক লেখা

করোনা বিষয়ক লেখা

মোস্তাফিজুর রহমানের গল্প-করোনাকালে সীমিত আকারে শপিং

পড়াশোনা শেষ করে রাকিব খান সরকারি চাকরি করছে। সুন্দরী বৌ রাবেয়া খানম আর চাঁদের মত এক টুকরো পিচ্চি ছেলে রাহাত খান কে নিয়ে সে রাজধানীতেই বাস করে। সংসার ধর্ম, কাজ কর্ম ভালোই চলছে। কি সুন্দর সাজানো গোছানো সংসার! স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা দেখে প্রতিবেশিরা একদিকে যেমন প্রশংসা করে অন্যদিকে ভিতরে ভিতরে হিংসার আগুনেও জ্বলে। জীবনের সব সুখ যেন স্ব-ইচ্ছায় তাদের কাছে ধরা দিয়েছে। সংসারে চাঁদের টুকরো ছেলেটা আসার পর সুখ যেন আরো বেড়ে গেছে।

দেশে হঠাৎ মহামারীর আগমন। এই মহামারীর কারন এমন একটি ভাইরাস যেটার সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হাঁচি-কাশি হলেও দিনে দিনে এর রুপের পরিবর্তন হচ্ছে। অদৃশ্য এই শত্রুর কাছে সারা পৃথিবী বিপর্যস্ত। রাকিব একজন সচেতন মানুষ। লকডাউনের কারনে বাসাতে তার সময় কাটলেও অন্যান্য কাজের পাশাপাশি সে নিয়মিত খবর দেখছে এবং কতোজন আক্রান্ত হচ্ছে আর কতোজন মারা যাচ্ছে তার হিসাব রাখছে। পৃথিবী যেন অসুস্থ হয়ে গেছে, কবে যে আবার সুস্থ হবে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এখন রোজার মাস। কদিন পরই রোজা শেষ। তারপর ঈদ। দেখতে দেখতে ২৫ রোজা পার হলো, ঈদকে কেন্দ্র করে শপিংয়ের একটা ব্যাপার আছে। শপিং ছাড়া যেন ঈদের আনন্দের সঙ্গা রচিত হয়না। এবারের পরিবেশটা মোটেও উপযুক্ত নয়। কিন্তু কয় জনই-বা বুঝবে সেটা! ওদিকে পাশের বাসার নীলা ভাবি বিকালে এসে রাবেয়াকে  বলেছে, “ও ভাবী তোমরা কবে যাবে শপিংয়ে? এখনো যাওনি কেন ? সীমিত আকারে খোলা আছে তো। পরে কিন্তু কিছুই পাবানা। ভাইতো দেখছি তোমাকে ভালোই বাসে না। আর ওদিকে আমার বাবুর আব্বু কত্তো ভালো, আমাকে এতো এতো শপিং করে দিয়েছে।” রাবেয়া রীতিমতো রেগে আগুন। এমনিতেই সে একটু আবেগপ্রবণ, তার উপরে আবার কানভাঙানি। কে জানে রাকিবের কপালে আজ কী আছে!

ইফতারির পর নামাজ শেষে রাকিব বিশ্রাম করছে। এমন সময় রাবেয়া হঠাৎই বললো, “আমার কিচ্ছু ভাল্লাগছে না। আমি যে কি করব নিজেই জানিনা। সবার স্বামী এতো এতো শপিং করে দিচ্ছে আর আমার স্বামী….!” প্রত্যুত্তরে রাকিব বললো, “সোনাপাখি রাগ করো না। আমার কথা শোন। করোনা ভাইরাস এতো বেশি ছড়াচ্ছে বাইরে অনেক রিস্ক। এ অবস্থায় শপিংয়ে যাওয়াটা একদমই ঠিক হবেনা। যতটা সম্ভব ভিড় এড়িয়ে চলাটায় মঙ্গল।” সাথে সাথে রাবেয়া আবারো বললো, “কি যে বলো তুমি, পাশের বাসার ভাবি অনেক শপিং করেছে। আমি এতো কিছু বুঝিনা, আমি লিস্ট করে ফেলেছি তুমি আগামীকাল আমাকে নিয়ে শপিংয়ে যাবা তাই জানি।”

ওরে বাবা…! কি যে দিনকাল আসলো এখন ভালোবাসা পরিমাপের মাপকাঠি হচ্ছে শপিং। এতোদিনের ভালো স্বামীটা তার ভালোত্ব হারিয়ে ফেলবে যদি বৌ’কে লিস্ট অনুযায়ী শপিং করে না দেয়। স্বামী পড়েছে মহাবিপদে। প্রতিদিনই নতুন শনাক্ত, নতুন মৃত্যু বেড়েই চলেছে…। সারাদেশের অবস্থা দেখে রাকিবের ভিতরে ভয় ঢুকে গেছে। অপরদিকে, রাবেয়া তো নাছোড়বান্দা। শপিং ছাড়া তার একদন্ডও চলবেনা। সে এককথার মানুষ। রাগীও আছে একটু।

লকডাউনের ভিতরে রাবেয়া রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন কাজ করছে। বেচারির অনেক কষ্ট হচ্ছে। অফিস বন্ধ,দু-মাস বেতনও বন্ধ তাই সেভিংসের টাকা দিয়ে ইদানিং কালের সমস্ত খরচ চালাতে হচ্ছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৌ আর ছেলেকে নিয়ে একরকম বাধ্য হয়েই রাকিব পরদিন সকাল ১০ টায় সীমিত আকারে শপিংয়ে চললো। নিজের জন্য কিছু কেনার ইচ্ছা না থাকলেও বৌয়ের কথায় একটা নতুন পাঞ্জাবি আর পাজামা নিতেই হলো। ছেলের একসেট পোশাক আর বৌয়ের সবকিছু মিলিয়ে ৭৮৯০ টাকা বিল হলো। অন্যবারের তুলনায় এটা কমই বলা চলে। ঈদের দিন বাইরে ঘুরতে যাবার কোন প্লান না থাকলেও পাশের বাসার ভাবির উপর জেদ করেই এইসব কাপড়-চোপড় কেনা।

শপিং থেকে আসার এক সপ্তাহের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী দুজনার কলিজার টুকরো ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়লো। গায়ে প্রচন্ড জ্বর। কাশিও হচ্ছে একটু একটু। ঔষধ তাকে খাওয়ানো হচ্ছে। রাকিব সেদিনও খবরে দেখেছে এটা করোনা ভাইরাসের লক্ষণ। তার মনে হল, রাহাত এটাতে আক্রান্ত হলেও হতে পারে কারণ মার্কেটে সেদিন ঠিক তেমনি ভিড় ছিল জনপ্রিয় দুটি টিমের খেলা হলে স্টেডিয়ামের গেটে যেমন ভিড় হয়। তাছাড়া শাড়ি কিনে বেরিয়ে আসার সময় ঐ গলিতে ভিড়ের ভিতরে একটা লোক বাবুর কাছেই হাঁচি দিয়েছিল আর ঐ সময় বাবুর আম্মু ওর মাক্স খুলে কি যেন খাওয়াচ্ছিল।

ছেলেটা মাঝে মাঝে এমনভাবে কাঁদছে যেন সেই কান্নার পাহাড় সম চাপ রাকিবের বুকে অনুভূত হচ্ছে। ছেলেকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনই উদ্দিগ্ন, অস্থির, পাগলপ্রায়। প্রেম করে বিয়ে করলেও বৌয়ের প্রতি রাকিবের যতটা ভালবাসা তার চেয়ে বেশি ভালোবাসা রয়েছে ছেলের প্রতি। রাবেয়ার দিক থেকেও একই ব্যাপার। যদিও ভিতরে ভিতরে রাবেয়ার অপরাধবোধ কাজ করছে তারপরও স্বামীর অস্থিরতা দেখে সে বলল, “তুমি শান্ত হও, হৃদয়কে ডাক্তার দেখালে সব ঠিক হয়ে যাবে। এটা এমনি জ্বর। তাছাড়া আমরা তো প্রটেকশন নিয়েই গিয়েছিলাম।” প্রচন্ড রাগের সাথে রাকিব বললো, “তুমি চুপ করো, তোমার জন্য রাহাতের আজ এই অবস্থা। আমি আর দেরি করতে চাইনা আমি ওকে হাসপাতালে নিতে চাই, করোনা টেস্ট করাতে চাই। তোমার আর আমারও টেস্ট করানো উচিত।”

পরদিন তারা তিনজন কাছাকাছি একটা হাসপাতালে উপস্থিত। হাসপাতালে ইদানিং কালের নতুন নিয়ম হয়েছে সেটা হলো যেকোন রোগী আসলে তাদেরকে আগে করোনা টেস্ট করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর রাকিবকে টেস্টের রেজাল্ট জানানো হলো। ডাক্তার বললো, “কষ্টের ব্যাপার হলেও এটা সত্য যে আপনি, আপনার ওয়াইফ এবং আপনার ছেলে তিনজনই করোনা পজিটিভ। করোনাকালে শপিংয়ে যাওয়া আপনাদের একদমই উচিত হয়নি। ভেঙে পড়বেন না, মনকে শক্ত করুন। নিয়মকানুন যথাযথভাবে মেনে চললে অচিরেই সুস্থ হয়ে যাবেন। শুভকামনা রইল।” পজিটিভ রেজাল্ট শোনার পর আকাশ ভেঙে রাকিবের মাথায় পড়ল। তার সন্দেহ শেষমেষ সত্যি হলো। সুখের সংসারে দুঃখের ঘনকালো মেঘ নেমে এলো। করোনাকালে সীমিত আকারে শপিং কতোটা বিষাদময় যন্ত্রণা বয়ে আনতে পারে সেটা তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। করোনার নিষ্ঠুর আঘাতে তারা তিনজন এখন ডেডিকেটেড হাসপাতালের বিছানায় যুদ্ধ করছে সুস্থ হয়ে আবারো স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায়।

রবিউল হাসনাত সজলের কবিতা-হেসে উঠবে দারুন পৃথিবী

 

 

হেসে উঠবে দারুন পৃথিবী

রবিউল হাসনাত সজল

আমার আমিকে

হারিয়েছি সেই কবে

কোন এক জোছনা ভেজা রাতে

যে রাতের আঁড়াল সরিয়ে সুখ

নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে গৃহস্থলি জীবনে

অথচ কাচা আমিটা আজো কি ভীষণ

কাচা-ই থেকে গ্যাছি একাকি বিকেলের পাটে

এখন আমি প্রতিদিন হেঁটে যাচ্ছি

মৃত্যু নগরীর রূপসী পাড় বেয়ে বেয়ে

আমার সে পথ চলা-

কখনো থামাতে পারেনি পথের ক্লান্তি,

থামাতে পারেনি আম্পানের বিভৎস চিৎকারে

থামাতে পারেনি নভেল করোনার লম্বা মৃত্যু মিছিল

কিম্বা পঙ্গপালের ডানা ঝাপটানো কোন এক

অশনি সংকেতেও;

এখন আমার দৃঢ় দুটি পা-

চোখ-কান- নাক আর অতৃপ্ত আত্মা

ভীষণ ব্যাকুলতায় পথ চেয়ে আছে সেই

অদৃশ্য সত্ত্বার-

তিনিই তো পাঠাবেন মুক্তির দূত

থেমে যাবে ঝড়-ভেঙে যাবে ভয়

থমকে যাবে মৃত্যু মিছিল

আবার ঘুরে দাড়াবে প্রকৃতি

হেঁসে উঠবে আমাদের এই দারুণ পৃথিবী

শামীম বাদলের কবিতা-তছনছ সুখের তপোবন

 

 

তছনছ সুখের তপোবন

শামীম বাদল

 

নীরব আঘাতে পৃথিবী….

মনটা বেজায় ভারী,

তাগুদে শক্তি গুলো

ভাইরাসের কবলে বন্ধী সরাসরি।

লকডাউন, হোম কোয়ারেন্টাইন

সামাজিক দুরত্ব,

বাক্সবন্ধী শব্দ গুলো

এখন দেখায় বীরত্ব।

খেটে খাওয়া মানুষ যতো

খিদের জ্বালায় করে হাসফাঁস,

সুবিধবাদী চোরেরা গড়ে

নিত্য নতুন ইতিহাস।

কয়েকদিনের ফাঁক পেয়ে

ঘরবন্দী মানুজন,

করোনা কেনার প্রতিযোগিতায়

চালালো ভীষণ আয়োজন।

নবান্ন উৎসব, রমজান গেলো

আম্পানের সাথে ঈদ,

বাড়ি বাড়ি শোনা যাবে না

ধান ভাঙার গীত।

দুঃখ এখন রাজত্ব করে

সুখের তপোবনে,

মৃত্যু এসে হাতছানি দেয়

বুকের জমিনে।

মো. সামসুজ্জামানের কবিতা-ঢেউ তোলা তরঙ্গে ভাসে দিন রাত

 

ঢেউ তোলা তরঙ্গে ভাসে দিন রাত

মো. সামসুজ্জামান

কত জীবনের-কত রকমের

খেলা দেখি, বিস্ময়ে জীবন মৃত্যুর

অমানিশায় ভুগি, তবু জানিনা

কখন কি হবে জীবনের খেলা ঘরে।

এসেছি পৃথিবীর পরে- অভিনয়

রঙ্গমঞ্চে আমি দেখেছি কত মানুষের

অজস্র আহাজারি-কেহ হাসে, আবার

কেহ বা কাঁদে- কেহ বা রঙ্গ রসের

নাগর দোলায় ঘুরপাক খেলে।

এই সব জীবনের নানা রকম ছবি

যখন ভেসে ওঠে আমার হৃদয় অন্তরে,

তামাশার দুর্বিপাকে- তখন ভুলে যাই স্মৃতির বেদনায়

লেগে থাকা দুঃখের আঁধার রাত্রির

দুঃস্বপ্নের কত যন্ত্রণার ছবি-

দেখি, পৃথিবীর জীবন মৃত্যু

ভালবাসা মুহূর্তের ছলনায়

আটকে যায় তার অস্তিত্ব

বজায় রাখার প্রবল আশায়-

জীবনের সাধ, স্বপ্নের ঢেউ তোলা তরঙ্গে

ভাসে দিন রাত।

আমিরুল ইসলাম রন্টুর কবিতা-বুড়ি

 

বুড়ি

আমিরুল ইসলাম রন্টু

ও পাড়ার এক বুড়ি

ভাজে শুধু মুড়ি,

হাতে বাজায় তুড়ি

নেই তার জুড়ি।

বাক বাকুম পায়রা

আস্তে খেলিস ভায়রা

কুড়ি মুড়ি খায় না

নেই কোন বায়না।

কাছে কেউ যায় না

আছে কেবল গয়না।

একটু যদি যায়

অমনি ঘাড় মটকায়।

শাহ‌রিয়ার সো‌হেলের গল্প-কৃষ্ণচূড়ার ম‌তো থোকা থোকা লাল

 

কৃষ্ণচূড়ার ম‌তো থোকা থোকা লাল

শাহ‌রিয়ার সো‌হেল

 

বেতন হয়নি এখ‌নো এমন একটি বেসরকারি কলেজে চাকরি করেন তিনি। অনেকের হাত পা ধরে মোটা অঙ্কের টাকা ডোনেশন দিয়ে তারপর এক অনিশ্চিত কলেজে চাকরি পেয়েছেন। ডোনেশনের টাকা জোগাড় করেছেন বাবার কিছু জমিজমা বিক্রি করে এবং কর্জ করে। সে টাকার সুদ ক্রমশ বেড়েই চলছে। কীভাবে শোধ হবে তিনি জানেন না। তার ছেলের প্রথম জন্মদিন ভালোভাবে উদযাপন করতে পারেননি। ইচ্ছা ছিল আশেপাশের কিছু লোককে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াবেন। হলো না। ভে‌বে‌ছি‌লেন বেতন  হলে নিশ্চয়ই তিনি দ্বিতীয় জন্মবার্ষিকী ধুমধাম করে পালন করবেন। হ‌লো না। ভেবেছিলেন তৃতীয় জন্মবার্ষিকী পালন করবেন। হ‌লো না। এভাবে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ,,, হলো না, হলো না আর হলো না। একটি ভাঙা সাইকেল নিয়ে তিনি কলেজে যাতায়াত করেন। ভাবেন, এবার হয়তো বেতন হয়ে যাবে। হ‌লো না। চোখের সামনে মনের ভেতর রাশ রাশ হতাশা ফে‌নিলোচ্ছ্বা‌সে ভে‌সে বেড়ায় বিস্তৃত প‌রিধী জুড়ে।

দিন যায়,,, দিন চলে যায়,,,। চোখে চালছে পড়ে। চশমার কাচের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হয় বহুগুণ। সাইকেলের বেশ কয়েকটি স্পোক ভেঙে গেছে। সাইকেলের মাঠ-ঘাট নেই। টিউবে অজস্র জোড়া লাগানো। টায়ার সেলাই করা। তবু তিনি কলেজে যান নিয়মিত। এবার হয়তো বেতন হবে, এক বুক প্রগাঢ় মিথ্যে বিশ্বাস নিয়ে তিনি সদম্ভে হেঁটে ফেরেন।

কৃষ্ণচূড়ার ফুল তার খুব প্রিয়। এত ভালো লাগে কেন, সে নিজেও জানে না। এত বৃহৎ বিস্তৃত আঙ্গিনা জুড়ে যে বৃক্ষ থোকা-থোকা লাল এর বন্যা বইয়ে দেয়, তার বুকের বেদনাও হয়তো অনেকটা এরকমই। তাই হয়তো মিলে মিশে যায়, কৃষ্ণচূড়ার সাথে অপরিসীম ভালোবাসায়। সুযোগ পেলেই তিনি কৃষ্ণচূড়ার কাছে আসেন। হৃদয়ের দগদ‌গে লাভার মতো কষ্টের ফুল দেখেন। বেদনা জড়িত আবার আনন্দে উদ্ভাসিত স্বকীয় সত্তা।

ক‌লেজ আঙিনায় অনেকগুলি কৃষ্ণচূড়ার গাছ ছিল। একদিন বাসায় ফেরার পথে এক বালককে জিজ্ঞাসা করল, সে কৃষ্ণচূড়া গাছে উঠতে পারে কিনা? প্রচুর ফুল হয়েছে সে সময়। দু’টাকা দেয়া হবে বলতেই বালকটি সানন্দে রাজি হয়ে যায়। শিক্ষক দেখলেন, দু’টাকার কথা শুনতেই ছেলেটি কেমন ফুরফুরে বাতাসে নেচে উঠল। তার মনে হলো, ছেলেটির দু’হাতের পাশ থেকে দুটি অদৃশ্য ডানা গজিয়েছে। সে তরতর করে দীর্ঘ বৃক্ষের শীর্ষে উঠতে লাগল। মাঝে মাঝে শিক্ষক ভয় পাচ্ছিলেন, যদি পড়ে যায় ! ধীরে ধীরে উঠতে বললেন তিনি। কিন্তু ছেলেটি যেন কোন কথাই শুনতে পাচ্ছিল না ! সে গাছের শীর্ষে উঠে বেশ কয়েক গোছা ফুল পেড়ে দিল। শিক্ষক খুব খুশি হলেন। তরতর বেগে প্রবাহিত পানির স্রোতের মতো নেমে এলো ছেলেটি। দু’টাকা দিতেই বাতাসে ডানা গজিয়ে প্রজাপতির মতো উড়ে গেল। এই অতি তুচ্ছ-অল্প-নগন্য-সামান্য টাকা দিয়ে সে কী করবে ? তার চোখে-মুখে যে আনন্দের প্লাবন দেখা গেল, তা অকল্পনীয়-আশাতীত। ছেলেটি কি এক কাপ লাল চা আর একটি সিঙ্গাড়া খাবে ? নাকি মুড়ি খাবে ? নাকি আইসক্রিম খাবে ? নাকি পাউরুটি খাবে ? নাকি জমাবে ? নাকি খেয়ে ফেলবে পৃথিবী সব-সব যাবতীয় সুখাদ্য ? দু’টাকার জন্য হয়তো বালকটির ঘুম হয়নি দু’রাত !

শিক্ষক ভাবেন, তার মৃত্যু হলে, কেউ যদি তার কবরের মাটিতে মাথার ওপর একটি অনবদ্য কৃষ্ণচূড়ার গাছ লাগিয়ে দেয়, তাহলে তিনি খুব খুশি হবেন। তার বুকের অজস্র বেদনাও পুঞ্জীভূত থোকা-থোকা লাল হয়ে ছড়িয়ে পড়বে দশ-দিগন্তে…।

জহর দফাদারের গল্প-ডাক্তার আসিবার পূর্বেই

 

 

 

 ডাক্তার আসিবার পূর্বেই

জহর দফাদার

 

কবির আসতে একটু বিলম্বই হয়েছে; ঘাট হয়েছে- নতমুখে স্বীকার করতে কোনও বাধা নেই। কবি প্রস্তুত!
বারবার বলে দিয়েছে ডাক্তার, ঠিক সাড়ে চারটেয় দেখা হবে মধ্যশহরের একমাত্র লাল-নীল-হলুদ-বেগুনি-সবুজবেষ্টিত সৌন্দর্যে।
প্রথম দেখা হবে, চারচোখের মহামিলন!
কবি- একদম অগোছালো! যথারীতি সময়জ্ঞানের ঘাটতি নিয়ে পাঁচটার দিকে জোরকদমে আপিস ছাড়ে।
রাস্তাটা বড় বেহায়া মনে হয় তার। রিকশার টুংটাং, ট্যাক্সির ভেপু, মোটরসাইকেলের কান ঝালাপালা বিরক্তিকর শব্দ মোটেও সহ্য হয় না ইদানিং।   অথচ, এই ধুলোভরা শহরটাকেই আজন্ম ভালবেসে থেকে গেছে সে।
ফুটপাথ ধরে এগুতে গিয়েই চোখে পড়ে জীর্ণ-শীর্ণ হাতপাতা মানুষের দল। চোখ সয়ে আসা হকারদের কাব্যিক আহ্বান- আসেন, আসেন- কম রেট, মাল ভাল !
উরাধুরায় বন্দী এই জীবনের স্রোতে হঠাৎ করেই সবুজের হাতছানি!
আজ ডাক্তার আসিবার পূর্বেই কবি ঘটনাস্থলে পায়চারি করবে- দৃঢ়তার কমতি ছিল না একটুও।
কিন্তু ছয় ইঞ্চি কপাল যে তার; আপিসের বস- বেরুনোর আগেই ডাক দিলেন- স্টোরিটা একটু দেখে দিয়ে যাও, কবি ! কালকের পাতায় ছাপা হবে যে !
বসের খুব বিশ্বস্ত কবি; শুধুই বিশ্বস্ত কেবল কাজের জন্যে।
ইতস্তত করতে থাকে সে, বস- একটু তাড়া ছিল যে !
: আরে, সামান্য একবার চোখ বুলিয়ে গেলেই হবে ! তোমার চোখে যাদু আছে- এক ঝাপটায় সব এলামেলো কথা পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে…

সবুজের বিশাল গেটখানার সামনে পৌঁছে গেছে কবি।
বুকের ভেতর থেকে দুঃশ্চিন্তার ধুলোমাখা বাতাস দ্রুত বের হয়ে যায়। সেখান থেকে পরমানন্দের একটা মৃদূ শব্দ বের হয়- আহ !
ভেতরে ঢুকেই ডাক্তারের স্কেচ করা দক্ষিণ-পূর্ব কোণার বেঞ্চের দিকে দ্রুত পায়ে এগুতে থাকে সে। গাছপালা-আর ঝোপের আবডালে কিছুই দেখা যায় না। সে হাঁটতে থাকে…

দু’চার মিনিটেই পৌঁছে যায় লোহা আর কাঠের অপূর্ব কম্বিনেশনে তৈরি বেঞ্চের দিকে!
ঘড়ি দেখে, ৫টা ১৫ মিনিট ! ডাক্তার তবে কি চলে গেলো ?
কেউ নেই। বুকের ভেতর দুম করে মোচড় দেয়; কষ্টের দলা উঠতে থাকে। কত কথা পাক খায় মস্তিষ্কে, ঝিম ঝিম করতে থাকে।
বেঞ্চের সামনে নীলজলের পুকুর। পাড়টি ভরা দুবলোয়; দু’একটা ঘাসফুল চকচক করছে তারুণ্যের রঙে। বাতাসে দোল খাচ্ছে দুবলোর কচি ডগা !

আজ দেখা হবে ডাক্তারের সঙ্গে। কতকিছু তার কল্পনায় রঙ ছড়িয়ে ছিল। কী রঙের ড্রেস পরা থাকবে তার, গায়ে অ্যাপ্রন জড়িয়ে আসবে, না কি ময়ূরকণ্ঠীরঙা শাড়ি? না কি হালকা গোলাপি কামিজের সঙ্গে টকটকে লাল টিপ কপালজুড়ে… আনমনা হয় সে
আজ ডাক্তার তাকে গান শোনাবে !
ডাক্তারের মিষ্টিকণ্ঠে রবিঠাকুরের গান কেমন শোনাবে ! ও কি আধুনিক গান করে ? ভাবনায় কতকিছুই আসছে। অথচ, কবির সামনে কেবল জল আর জল !
চিন্তার পরিবর্তন ঘটে হঠাৎ; পেছনে কার পায়ের শব্দ শোনা যায়। চকিত পিছু ফেরে সে !
হা হা হা
বাদামওয়ালা ছেলেটা তার কর্কশকণ্ঠে হাঁক দেয়, বা..দে..ম ! স্যার, অ্যাকলা বইসা রইছেন, একটা ঠোঙা লন- টাইম পাস !

স্বপ্নের ছায়াছবিতে ছন্দপতন ঘটে কবির। সম্বিত ফিরে পায়, দাও-
বেঞ্চে বসে বাদাম চিবুতে চিবুতে কল্পনার রঙ ফের ছড়ায় সে।
কবি নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে।  ইশশশ, সময়মতো আসতে পারলে আজ দেখা হতো, কথা হতো, গান শোনা… সবকিছু ওই শালার বসের কারণে। বসকে কষে কয়েকটা ডাস্টবিনসম গাল দিয়ে দেয় সে।
সময়ের হেরফেরে আজ এই দিনটা আনন্দময় স্মৃতির বিপরীতে বিষাদময় নীলরঙা ক্যানভাস হয়ে গেল- ভাবতে ভাবতে দু’চোখের কোণে চিক চিক করে ওঠে শিশিরবিন্দু! নিজেকেই ধিক্কার দিতে থাকে সে ।

খুব চায়ের তেষ্টা পেয়ে তার। বেঞ্চ থেকে উঠে আশপাশে তাকায় কবি। আশেপাশে কোলাহলময় আনন্দউল্লাস নজরে আসে তার। কেবল নিজের বুকের ভেতরটাই খা খা করছে। গোটা সবুজ অরণ্য এক লহমায় দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনে। একটু জটলা দেখে পা বাড়ায় সে…

তিন চার তরুণ এক ফ্লাস্কওয়ালার কাছ থেকে ওয়ান টাইম কাপে চা নিচ্ছে, হৈ হট্টগোল করেই। তাকে দেখে ছেলেটা জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকায়।  হা সূচক মাথা নেড়ে ফের সেই বেঞ্চে গিয়ে বসে।
ছেলেটি সুন্দর ফুলছাপা একটি কাগজের কাপে এক কাপ চা এগিয়ে দেয়।
চায়ে চুমুকের সঙ্গে সঙ্গে ধোয়ার নেশাটা মাথাচাড়া দিলে শান্তিনিকেতনের ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একটা শলাকা ঠোঁটে লটকে দেয়। দিয়াশলাইয়ের কাঠিতে আগুন জ্বেলে সম্মুখপাশে ধরে সে।  একবুক ধোয়া সরাসরি পাঠিয়ে দেয় ফুসফুসে, এরপর পরম যত্নে নাকমুখ দিয়ে বের করে প্রশান্তির শব্দ করে- আহ !

ডাক্তারের অদেখা মুখটি কল্পনায় আঁকার চেষ্টা করে কবি। মায়াবিমুখে প্রসন্নতার ছায়া তাকে এনে দেয় প্রশান্তি।
ভাবনার জগতে ফের হারাবে সে।

কবি !
ডাকটা বেশ পরিচিতই মনে হয় তার। নিজের নামটি এভাবে কারো মুখে সে শোনেনি এই জনমে। এমন মধুঝরা, চুড়ির ঝঙ্কার- শোনেনি সে আগে।
পিছু ফিরতেই তার চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন হয় !
মুখ থেকে অগোচরে বেরিয়ে যায়, প্রায় অস্ফুটস্বর- ডাক্তার !

অপলক চেয়ে থাকে সে।  কল্পনাকে হার মানানো রঙে এসেছে এক মায়াভরা মুখ। তার মুখায়বে ঝরে পড়ছে জগতের সব কৌতুহল। রেলের মতো বয়ে চলে ডাক্তারের কথার বগি- জানো পথে কী যানজট ! একটার পর একটা রিকশা থামায়, কেউ যাত্রী নিতে চায় না। আধাঘণ্টার মতো কেবল তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা কেউই সওয়ার নেবে না, আসবে না এই সবুজারণ্যে… অগত্যা, পা সম্বল করেই- তুমি অনেকক্ষণ বসে আছো, তোমার অনেক বোরিং সময় গেছে। খুবই শরমিন্দা, আসলে আমার করার কিছুই ছিল না…

কবির কর্ণকূহর স্থবির; কিছুই শুনতে পায় না সে। তার দু’চোখজুড়ে ডাক্তারের ধনুকবাঁকা ভ্রু, হরিণচোখের ছোটাছুটি, গোলাপের পাপড়ির মতো ওষ্ঠধারার নাচন !

ড. শাহনাজ পারভীনের-এবারের ঈদ, আমার ঈদ

এবারের ঈদ, আমার ঈদ

ড. শাহনাজ পারভীন

 

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।”

প্রতি বছর পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলেই ঘরে ঘরে, এই গানে আনন্দে নেচে ওঠে মন! কিন্তু এ বছর? এ বছরের ঈদ একেবারে আনন্দহীন। অন্য রকম। আর পাঁচটা দিনের মতোই  মিলনবিহীন এক সাধারণ দিন।

 ঈদ অর্থ আনন্দ। ঈদ অর্থ খুশি। প্রতিবছর ঈদ কে কেন্দ্র করে দেশে দেশে এক অনাবিল আনন্দ আবর্তিত হয়। একমাস সিয়াম সাধনার পর যাকাত, ফিতরা, দান, ধ্যান, কেনাকাটা, পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে মানুষ পরিপূর্ণভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে। প্রতিবছর ঈদের সকালে আতর, সুবাস, নতুন পোশাক, ফিরনি, সেমাই, ঈদের নামাজ, কোলাকুলি, পোলাও, কোরমা আর সারাদিনের ফিরিস্তি নাই বা বলি!

কিন্তু এবার? রোজার আগে থেকেই শুরু হয়েছে কোভিড নাইনটিন, করোনা ভাইরাস, মৃত্যূ ভয়। বিশ্বজুড়ে কঠিণ মহামারির বিভীষিকাময় এক আতংক। মানুষ স্বেচ্ছায় ঘরে বন্দি। সারা বিশ্ব লকডাউন। সেই সতের মার্চ শেষ কলেজ করেছি। দফায় দফায় বেড়েছে দেশের সাধারণ ছুটি সহ আতংক এবং মৃত্যুহার। এবারের রোজায় প্রতিদিন নিয়ম করে আর কিছু না হলেও বেলা আড়াইটায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বুলেটিন নিয়ম করে দেখেছি, হিসাব রেখেছি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং প্রতিদিন যোগ হওয়া নতুন মৃত্যু তালিকা।  আজ কী বার, কত রোজা, কত তারিখ সে সব কারো মনে না থাকলেও আজ দেশে নতুন করে  কতজন আক্রান্ত হয়েছে, কতজন মৃত্যু বরণ করেছে করোনায়, তার মধ্যে কত জন পুরুষ আর কতজন মহিলা, তাদের বয়সের কোঠায় কে কোন অবস্থানে, এই সবকিছু আমাদের মুখস্থ থেকেছে এবং করোনার এততম দিনে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় তার তুলনা করতে করতেই দিনের পর দিন আমরা ব্যস্ত থেকেছি। নিয়ম করে অভ্যাস বশত পবিত্র কোরআন শরীফ এক খতম দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তার তাফসির, ব্যাখ্যা করার মতো সময় এবং মনোনিবেশ কোনটাই সঠিক ভাবে করতে পারিনি।

এই রোজায় আমাদেরকে ঘরের প্রতিটি কাজ নিজহাতে  করতে হয়েছে। এবার নিশ্চয়ই সকলে বুঝে গেছি, ঘরে ঘরে গৃহকর্মীর গুরুত্ব কতো? মাস গেলে তাকে ঠিকই টাকা পেমেন্ট করছি, বাড়তি দিচ্ছি প্রতি মাসেই। প্রয়োজনে একটু পাশের দোকানে পাঠালেও রিকশা ভাড়া হিসাব করে এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে নিজের দায়বদ্ধতায় অধিক হারে কৃত দ্রব্যাদির সাথে সাথে পেমেন্ট করছি নগদ অর্থও। তাদের তো কাজ করতে অসুবিধা নেই, কাজ করতে এক পায়ে খাড়া। আমরাই আমাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ছুটা গৃহকর্মীকে ঘরের ভেতরে ঢুকাচ্ছিনা। প্রতিদিন নিয়ম করে ময়লা ফেলতে আসে। সিঁড়ি পরিষ্কার করে, আঙিনা ঝাড়ু দেয়। বাইরের টুকটাক কাজ করে। কিন্তু ভেতরের রান্নাসহ সমস্ত কাজ নিজেরাই এ রোজায় করেছি। এ বছর রোজা আমাদেরকে কৃচ্ছতা সাধনার পাশাপাশি কর্মঠ হতেও শিখিয়েছে। কিছুটা হলেও শিখিয়েছে তাদের প্রতি আমাদের মমতা ও কৃতজ্ঞতা বোধ ।

এবার তারাও বুঝেছে, পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি ডাল আর দুই কেজি আলুর জন্য এই গরমে রোজা থেকে  কতটা পথ হাঁটতে হয়, কতবার মাস্ক বাঁধতে হয় আর কতবার পুলিশের দাবড়ানি খেতে হয়। তাই তারাও গার্মেন্টস কর্মীদের মতো খুবই আন্তরিক, মাস গেলেই নগদ টাকার নিজেদের চাকরিটা বাঁচাবার জন্য। প্রতিদিনই তারা আসে, অথচ আকাঙ্খিত তাদের দেখে খুশি না হয়ে তিন হাত দূরে থাকি করোনার ভয়ে।

আমার কাজের চাচী বিশ রোজার পর থেকেই প্রতিদিন সকালে এসে আমাকে জোর জবরদস্তি করে জানালা,  দরজার পর্দা, সোফার কাভার, বিছানার চাদর, কাপড় চোপড় ভিজিয়ে দাও, আমি ছাদে নিয়ে কেচে দেবো। নাছোড়বান্দা। অথচ অন্য বছর তার সময় থাকে না, আমাকে নাছোড়বান্দা হতে হয়। সে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতো দু পয়সা বাড়তি রোজগারের জন্য।  এবার অন্তত এগুলো না করলে তার বাড়ির সবার জন্য ঈদ বোনাস আশা করে কিভাবে? তাই তার এই জবরদস্তি! তবুও ভালো লাগে। ঈদ ঈদ মনে হয়!

এবারের ঈদে আমাদের জন্য কোনো কেনাকাটা নেই। ছেলেটা ইউনিভার্সিটি ছুটি হলেই অল্প কাপড়ে চলে আসছিলো বাড়িতে। জানতো না তো, দফায় দফায় এতটা দিন ছুটি বাড়তে পারে। তাকে কতবার বলছি, অনলাইনে দেখো। তার এক কথা,

–না মা, দরকার নেই।

 সে অনলাইনে ক্লাস, প্রেজেন্টেশান নিয়ে ব্যস্ত।  ফাইনাল এক্সাম কিভাবে হবে, সেইসব এসাইনমেন্ট নিয়ে তার দিন কেটে যায়। কেনাকাটায় কোন মন নেই। মেয়েদের কে জিজ্ঞেস করতেই

–না মা পাঠিয়ো না। আমাদের লাগবে না।

এবার আমাদের বাজেটগুলো বিলিয়ে দাও। তবে আমি সব সময় আমার নিজের খুশি তালাস করি। আমার মনকে খুশি করতে পারলেই আমি খুশি হয়ে যাই। বিবেককে খুশি করতে পারলেই আমি খুশি হয়ে যাই। সংগঠনের পক্ষ থেকে, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে যতটুকু সামর্থ্যের মধ্যে পেরেছি, দিয়েছি। দিতে তো অনেক ইচ্ছে করে কিন্তু সামর্থ্যের ব্যাপারটি থেকেই যায়।

 সেভাবেই আত্মীয় স্বজন যে যেখানে আছেন সকলকেই একটু একটু দিতে চেষ্টা করি। নিজেও নিজের জন্য কেনাকাটা করি। মেয়ে জামাই, ভাইবোন, আত্মীয় স্বজনেরাও আমাকে পাঠায়। কিন্তু এবারের ঈদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিজেদের জন্য কেনাকাটার কথা একটি বারের জন্যও মাথায় আসছে না। করি নি।

 এই করোনা কালীন মহামারিতে দেশের নতুন দুর্যোগ স্মরণকালের ভয়াবহ “আম্পান” জনজীবনকে এক বিরাট ক্ষতির মধ্যে ফেলেছে। কিছু মানুষের মৃত্যু এবং কিছু কিছু এলাকায় ব্যাপক ক্ষতিসহ হতাহতের সম্মুখীন হয়েছে দেশ। ফসলের ক্ষতি, ফসলসহ ফলজ বৃক্ষ, কাঁচা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এই দুর্যোগে, এই মহামারিতে ঈদ আবার কি? যারা অসহায়, কর্মহীন মানুষ, তাদের দিকেই খেয়াল রেখেছি, যতটুকু পারি। এই আমার আনন্দ। ঈদের আনন্দ।

এবার করোনার কারণে মেয়েরা কেউ আসবে না। মেয়ে জামাই, নাতি, নাতনি, দেবর, জা আসবে না, কিন্তু ঈদ আসবে তা তো কোনদিন কল্পনাও করতে পারি নি। এবারের ঈদ হবার কথা ছিল অন্য রকম, আমাদের পরিবারের নতুন অতিথি আগমনের ঈদ! আহা!

আমার ঈদের চাঁদ সব সময় একটু আগেই ওঠে। আপনারা জেনেছেন, যখন থেকে আমার আম্মুরা আসতে শুরু করে, তখন থেকেই আমার ঘরে ঈদের চাঁদ ওঠে। শাওয়ালের চাঁদের জন্য আমার ঈদের চাঁদ অপেক্ষা করে না, অথচ এ বছর পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের চাঁদ উঠবে, কিন্তু আমার ঈদের চাঁদ উঠবে না ঘরে। এবার খোলা ময়দানে ঈদের নামাজ হবে না। হবে না কোলাকুলি। সালাম, সালামী! তাহলে আর ঈদ কী?

তারপরও প্রকৃতির নিয়মে ঈদ আসবে, ঈদ যাবে। এটাই নিয়ম।  এই নিয়ম মেনে নিয়েই ধৈর্য ধরতে হবে এবং প্রার্থনা করতে হবে, যেন মহান আল্লাহ্ পৃথিবী থেকে অতিশীঘ্রই মহামারী দূর করে পৃথিবীকে শান্ত, নির্মল এবং করোনামুক্ত এক শান্তিময় পৃথিবীতে মানুষের পরিপূর্ণ ঈদের আনন্দ ফিরিয়ে দিন। পৃথিবীতে সবার সাথে সবার মিলনের ঈদ হোক, শান্তির ঈদ হোক, আনন্দের ঈদ হোক আবারও– সে আকাঙ্খা নিরন্তর।